বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ ঐতিহ্যের পান চাষ

চট্টগ্রাম মহানগর

Sharing is caring!

ইমরান হোসেন,রাঙ্গুনিয়া:- চা-নাস্তা ও ভোজনের পর পান খাওয়ার রেওয়াজ বহু পুরোনো। ভোজনের পর মধ্য বয়সী থেকে শুরু করে বৃদ্ধাদেরও মিষ্টি- মিষ্টান্নের চেয়েও পান খাওয়ার হিড়িক প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত। তবে ঠিক কখন থেকে এ রীতি প্রচলিত তা অজানা।

একসময় অতিথি আপ্যায়ন, দাওয়াত ও বিয়েতে খাওয়ার পর পান দেওয়ার চিত্র ছিলো নিয়মিত। এখনও দাওয়াতে, অনুষ্ঠান, বিয়ে এসব উপলক্ষ্যগুলোতে খাওয়ার পর পান দেওয়ার রীতি আছে যদিওবা কালের বিবর্তনে এসব রীতি বিলুপ্তও হচ্ছে প্রায়। বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েরই বিয়েতে পানের ব্যবহার অপরিহার্য। বিয়ের একাধিক আচার-অনুষ্ঠানের নামের সাথেও যুক্ত ছিল পান।যেমন পানকড়াল, পানখিলি, পানচিনি, পান-পত্তর, পান-বাতাসা, পানশল্লা, পানের আলাপ ইত্যাদি। নাগরিক যাপিত জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এ-সব আচার-অনুষ্ঠানের অধিকাংশই আজ বিলুপ্তির পথে।

পান ‘পিপুল’ পরিবারভুক্ত গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের একপ্রকার গুল্মজাতীয় গাছের পাতা। আর্য এবং আরবগণ পানকে তাম্বুল নামে অভিহিত করত। নিশ্বাসকে সুরভিত করা এবং ঠোঁট ও জিহবাকে লাল করার জন্য মানুষ পান খায়। এছাড়াও ঐতিহ্যগতভাবে সামাজিক রীতি, ভদ্রতা এবং আচার-আচরণের অংশ হিসেবেই পানের ব্যবহার বহু পুরোনো। এক সময় বিভিন্ন উৎসব, অনুষ্ঠানাদিতে, পূজা ও পুণ্যাহে পান ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন অভিজাত জনগোষ্ঠীর মাঝে পান তৈরি এবং তা সুন্দরভাবে পানদানিতে সাজানো লোকজ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেত।

এক সময় রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ভোরের প্রথম প্রহরে মুয়াজ্জিনের আযানের পর নামাজ আদায় শেষেই গ্রামের প্রতিটি স্থানীয় বাজারে পানের হাট বসতো। পান চাষীরা আগের দিনই পান সংগ্রহ করে রাতে বিড়া করে রাখতো।পরের দিন খুব ভোরেই উপজেলার প্রায়সব স্থানীয় হাটেই বিক্রির জন্য নিয়ে আসতো। এখনও সে রীতির প্রচলন আছে। তবে এখন ক্রেতা বেশি হলেও আগের মতো এখন আর সারি সারি পানের বিক্রেতার দেখা মেলেনা।

প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়, নদী ভাঙ্গন, ঘনবসতি, উঁচু ফসলী জমির অভাব, প্রথাগত সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়া এসবে ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার ফলে পান চাষে আগ্রহ হারিয়েছে অনেক পান চাষীরা। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার আগে যেসব ইউনিয়নে পান বরজ ছিলো- পান চাষ হতো সেসব ইউনিয়নে এখন তুলনামূলকভাবে কমেছে পান বরজের সংখ্যা, কমেছে পান চাষ। আগে উপজেলার সরফভাটা, পদুয়া রাজারহাট, মরিয়ম নগর, স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া, রানীর হাট এসব ইউনিয়নে তুলনামূলকভাবে বেশি পান চাষ হতো।  এখন সেখানে কমেছে পান চাষ, কমেছে পান বরজের সংখ্যাও।

উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার সরেজমিনে দেখা যায় প্রতিটি পানের দোকানীর প্রতি খিলি পানের দাম ৫ টাকা করে নেয়। তবে মিষ্টি পানের দাম পড়ে প্রতি খিলি ৭ টাকা করে। সরফভাটা ইউনিয়নের ক্ষেত্রবাজারস্থ স্থানীয় পানের দোকানী মোহাম্মদ বদি (২৮) জানান; “বিগত পাঁচ বছর ধরেই তিনি খিলি পান বিক্রি করে আসছেন। উপজেলার স্থানীয় বাজার যথাক্রমে গোডাউন, রোয়াজার হাট, গোচরা হাট, শান্তির হাট ও লিচু বাগান থেকেই পান কিনে সংগ্রহ করেই বিক্রি করছেন। স্থানীয় এসব বাজারে  প্রতি মৌসুমেই পানের দাম বৃদ্ধি হয়ে থাকে বিশেষ করে শীতকালেই পানের বাজার বেশ গরম থাকে। কিন্তু উপজেলার বাইরে কিংবা জেলা সদরে পানের বাজার যতটা চলে তার ঠিক তুলনামূলক অনেক বেশি, ক্ষেত্র বিষয়ে দাম দিগুণও হয়ে থাকে।তাছাড়া জেলা সদরের বাজার গুলো থেকে পান কিনে আনলে এতে মহেশখালীর মিঠা পানের বিড়া’য় ৫০- ৬০ গন্ডা পান থাকে। আর রাজশাহী পান বা অন্য জাতের পানের বিড়া’য় ২০ গন্ডা করে থাকে কিন্তু আমাদের উপজেলার স্থানীয় বাজারের সিন্ডিকেটের কারণে দর দামের উর্ধগতি থাকার পরেও পান কিনলে দেখা যায় মহেশখালী থেকে আসা পানের প্রতি বিড়া’য় থাকে ৪০-৪৫ গন্ডা করে এবং অন্য জাতের পানের প্রতি বিড়া’য় থাকে ১৬-১৮ গন্ডা”। এদিকে উপজেলায় পানের বরজের সংখ্যা তুলনামূলক কমেছে। বেশ কিছু এলাকায় নাই বললেই চলে।সরেজমিনে দেখা যায়, নদী ভাঙ্গন ও ঘনবসতির ফলেই উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়ন ও মরিয়ম নগর ইউনিয়নে পান চাষ তথা পান বরজের সংখ্যা কমেছে রেকর্ড পরিমাণে।

জানা যায় আগে রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় প্রায় ১৫০ হেক্টর এলাকা জুড়ে পান চাষ হতো এখন সেখানে তুলনামূলকভাবে কমে প্রায় ৪০ হেক্টর এলাকা জুড়ে পান চাষ হয়। ভূমি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নদী ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে যদি সাহায্য সহযোগীতা করে পান চাষীদের উৎসাহিত করা হয় তবে পুনরায় পান চাষে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতো বেশ কিছু গ্রামীণ পরিবার এবং পুনরায় পান চাষের ফলে ফিরে আসতো বিলুপ্তপ্রায় বহু পুরোনো এই গ্রামীণ ঐতিহ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *