৭০ বছরে আওয়ামী লীগের যত অর্জন

জাতীয়

Sharing is caring!

বাংলাদেশ ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেন প্যালেস থেকে যাত্রা আরম্ভ করা এই দলটির ৭০ বছরের পথ চলায় রয়েছে অনন্যসব অর্জন। যেসব অর্জনে শুধু আওয়ামী লীগ নয় সমৃদ্ধ হয়ে জাতি, তৈরি হয়েছে একের পর এক মাইলফলক ও ইতিহাস। ৭০ বছরের পথ চলায় আওয়ামী লীগের এসব অর্জনের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।

টাঙ্গাইলের মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি ও শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হওয়া এই সংগঠনের নাম প্রথমে ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কোষাধ্যক্ষ হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। এসময় শেখ মুজিব কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। পাকিস্তান মুসলিম লীগ ভেঙ্গে গড়ে উঠা এই দলটি ছিল পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল।

প্রতিষ্ঠার পরদিন ২৪ জুন বিকেলে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে প্রকাশ্যে জনসভা করে। সভায় আনুমানিক প্রায় চার হাজার লোক উপস্থিত হয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বসহ ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। শুরুর দিকে দলটির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি, এক ব্যাক্তির এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের আন্দোলনে অনেকটা অভিভাবকের ভূমিকায় ছিল আওয়ামী লীগ। তৎকালীন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের জন্য প্রথম কারাবন্দী হন৷

১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর দলটি কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে আওয়ামী মুসলিম লীগ মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

১৯৫৪ সালের মার্চের আট থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়। এরমধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ।

ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি করার লক্ষ্যে ১৯৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দলের তৃতীয় সম্মেলনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়; নতুন নাম রাখা হয়: ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’।

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনেও ছাত্রদের সংগঠিত করে দিকনির্দেশনা দেয়ার কাজটি করেছিল আওয়ামী লীগ।

১৯৬৬ সালে পাঁচ ও ছয়ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছয় দফা দাবি পেশ করেন। এই ছয় দফা দাবিকে বলা হয় বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ। ছয় দফার পক্ষ্যে জনমত গঠনে আওয়ামী লীগ সর্বশক্তি নিয়োগ করে। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই পুরো জাতিকে একসুতোয় বাঁধতে সমর্থ হয়।

ছয় দফার সমর্থনে সর্ব প্রথম চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লালদিঘীর পাড়ে চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহচর তৎকালীন বৃহত্তর চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এম এ আজিজের নেতৃত্বে প্রথম প্রকাশ্যে সভা করেন বঙ্গবন্ধু। সেই সভায় এম এ আজিজ ঘোষনা করেন যে ছয় দফা না মানলে এক দফার আন্দোলন চলবে, সেটা হচ্ছে স্বাধীনতার আন্দোলন।পরবর্তীতে এই ৬ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনীতিক সংগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এই সময়ে শেখ মুজিব এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ আরো কিছু ছাত্র সংগঠন এক সাথে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে তাদের ঐতিহাসিক এগারো দফা কর্মসূচী পেশ করেন যা মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে হিসেবে সহায়তা করে।

গণআন্দোলন ও আইয়ুবের পতনের পটভূমিতে ‘৭০ এর নির্বাচনে কেন্দ্রীয় আইনসভায় (জাতীয় পরিষদ) পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন দখল করে আওয়ামী লীগ ৩১৩ আসন-বিশিষ্ট পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং সরকার গঠনে ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যোগ্যতা অর্জন করে। প্রাদেশিক পরিষদের আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন পায় দলটি। জাতীয় পরিষদের সাতটি মহিলা আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের দশটি মহিলা আসনের সবগুলোতেই জয়ী হয় আওয়ামী লীগ।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে আমন্ত্রণ জানানোর পরিবর্তে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাঙালির অধিকার নস্যাৎ করার পথ বেছে নেয়। এসব ঘটনা প্রবাহের মধ্যে ১৯৭১ এর ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৭ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় মুজিব নগর সরকার। এই সরকারের নেতৃত্বে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে শত্রু মুক্ত হয় বাংলাদেশ।

এরপর ৭৫ এর পটপরিবর্তন ও এর প্রেক্ষিতে নেমে আসা কলংকিত স্বৈরাচার সরকারকে হটিয়ে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় আওয়ামী লীগ।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করে। এই সময়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মত খাদ্যে সয়ং সম্পুর্ণ দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ এ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বাস্তবায়ন করে আওয়ামী লীগ। একই সময়ে উদ্যোগ নেয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাস্তবায়নের। বর্তমানে এই বিচার প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *