একজন অসহায় সেলিম শেখ ও একদল মানবতাবাদী ছাত্রের গল্প

ফিচার লাইফ স্টাইল

Sharing is caring!

আকবর হোসেন রবিন:- এখন বর্ষাকাল, মেঘ ডাকার সাথে সাথেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে আসে। বৃষ্টি পছন্দ করেনা এমন মানুষ খুব নগন্য। মানুষ চায় বৃষ্টির দিনে গায়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে বই পড়তে, মুভি দেখতে। আবার কেউ কেউ পছন্দ করে বাড়ির উঠোনে কিংবা ছাদে এসে বৃষ্টিতে ভিজতে। কবিরাও বৃষ্টি দেখে মাতাল হয়ে উঠে, লিখে গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা। এছাড়াও আমরা সকলে বৃষ্টি কামনা করি,ফসল বুনতে বা প্রচন্ড গরম থেকে রেহাই পেতে। কিন্তু এমন কিছু পরিবার অাছে যাদের জন্য বৃষ্টি অভিশাপ হয়ে অাসে। কষ্ট নিয়ে আসে। তাই তাদের কামনা বৃষ্টি না আসুক। বৃষ্টি না অাসলেই তাদের শান্তি। তারা একটু ঘুমাতে পারে। চুলোয় আগুন দিতে পারে। নামাজ পড়তে পারে। অন্তত একটু বসতে পারে। তেমনই এক পরিবারের কথা আজ লিখছি।

বলছিলাম চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার, উড়ির চরের বাসিন্দা সেলিম শেখের পরিবারের কথা। সেলিম শেখ তার স্ত্রী ও তিন মেয়ে নিয়ে এমন এক জীর্ণ কুটিরে বাস করে, যা প্রথম দেখায় যে কারো কাছে মনে হবে একটি পুরাতন পরিত্যক্ত ঘর। কিন্তু এখানেই তাদের রাত কাটাতে হয়, দিন পোহাতে হয়, বছর পার করতে হয়।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সেলিম শেখ আজ প্রায় আড়াই বছর ধরে জীবন্ত মূর্তি হয়ে ঘরে পড়ে আছেন। ব্রেইন স্ট্রোক করে প্যারালাইজড আক্রান্ত হয়ে হাত-পা অবশ হয়ে গেছে তার বছর দুয়েক আগে।

অসহায় এই দরিদ্র লোকের খবর পেয়ে তার বাড়িতে ছুটে যান সামাজিক সংগঠন উড়ির চর ছাত্র ইউনিটির সভাপতি মিলাদ দ্বীপরাজ। গিয়ে দেখেন সেলিম শেখদের মাথা গোঁজার মত ঘর নেই। দু’বেলা খাওয়ার মত খাবার নেই। তিনটি মেয়ে আর বাকহীন মৃতপ্রায় স্বামীকে নিয়ে অনাহারে দিনানিপাত করছে সেলিম শেখের বৃদ্ধা স্ত্রী। বিষয়টি তাকে খুবই নাড়া দিল। তিনি ঠিক করলেন এই পরিবারটির জন্য কিছু একটা করতে হবে।

এরপর তার সংগঠন উড়ির চর ছাত্র ইউনিটির সদস্যের সাথে নিয়ে সেলিম শেখদের ঘর নির্মাণের ভার কাঁধে তুলে নিলেন তিনি। সাহায্যের জন্য হাত পাততে থাকেন নানাজনের কাছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেলিম শেখদের জন্য সাহায্য চেয়ে প্রচার করার পর কিছু টাকা সাহায্যও পেয়ে যান। তাদের ডাকে সাড়া দেয় নানা শ্রেণী পেশার মানুষ ও কয়েকজন প্রবাসী। তবে শেষ পর্যন্ত যত টাকা সংগ্রহ করতে পেরেছে, সেটা দিয়ে থাকার মতো একটা ঘর তৈরি করা সম্ভব নয়। শুরুতে ভিটায় মাটি দেওয়া প্রয়োজন। সংগ্রহ করা টাকা খরচ করে মাটি কাটালে ঘরের কাজ শুরু করাই যাবেনা। তাই ছাত্র ইউনিটির সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিলো নিজেরাই মাটি কাটবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী উড়ির চর ছাত্র ইউনিটির একঝাঁক সদস্য কোঁদাল ও মাটি টানার পাত্র নিয়ে হাজির হলো সেলিম শেখের বাড়িতে। সারাদিন শ্রমিকদের মত মাটি কাটলো এবং বানানো হলো ঘর নির্মাণের ভিটা। পরে সংগ্রহ কৃত অর্থ দিয়ে গাছ কিনে সেলিম শেখদের বাড়িতে নিয়ে অাসেন। শুরু হয় সেলিম শেখদের ঘর তৈরির কাজ। কিন্তু এক পর্যায়ে এসে অর্থ সংকটে থেমে যায় কাজ। কাঠে বার্নিশ দেওয়া, পেরেক কিনা, কাঠমিস্ত্রীর মজুরিসহ নানা ক্ষেত্রে সংগ্রহ করা সব টাকা খরচ হয়ে যায়। এইদিকে অনেকে পরে নানা মাধ্যমে টাকা পাঠাবে এমন আশ্বাস দেওয়ায় সংগঠনের সদস্যরা বাকিতে টিন, কাঠ কিনে পুনরায় ঘর তৈরির কাজ শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সক্ষম হয় সেলিম শেখের পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি আনতে। তাদের মাথা গোজার ঠাঁই তৈরি করতে।

উল্লেখ্য, সামাজিক সংগঠন উড়ির চর ছাত্র ইউনিটি উড়িরচরের ছাত্রদের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। দূর্গম এ চরে ২০১৬ থেকে শিক্ষা প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। পাশাপাশি যেকোন মানবিক আবেদনেও সাড়া দিয়ে অসহায় গরীব লোকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *