ক্রন্দন

ফিচার সাহিত্য

Sharing is caring!

আকবর হোসেন রবিন:
বড় বোনের বিয়ে। চারদিকে আলোকসজ্জা, হৈ চৈ। সবার চোঁখে মুখে শুধু আনন্দ। এখানে দুঃখের কোন স্থান নেই। বাসা ভর্তি মেহমান। রাতে থাকার জন্য রুম খালি নেই। বিয়ে বাড়িতে সচরাচর যেমনটা হয়ে থাকে আর কি। তিনটে রুম, সব রুমেই খাটে ও নিচে বিছানা করা হয়েছে। তাও জায়গা হচ্ছে না। তাই কেউ কেউ নিকটবর্তী আত্মীয়দের বাসায় চলে গেছে। আমাকেও কারো বাসায় গিয়ে রাত কাটাতে হবে। ভেবে পাচ্ছিলাম না কার বাসায় যাবো। আগে কখনো কোনো বন্ধুর বাসায় রাতে থাকা হয়নি। তাই বন্ধুদের বাসায়ও যেতে ইচ্ছে করছিল না। হঠাৎ মনে পড়লো আকিব ভাইয়ের কথা। আরে! উনাদের তো পাঁচতলা বাড়ি আছে। নিশ্চয় সেখানে খু্ব আয়েশ করে থাকা যাবে। তাহলে এতো না ভেবে উনার ওখানে চলে গেলেই তো হয়। তখন কল দিয়ে আকিব ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, রাতে থাকার জায়গা হবে কিনা। উনি বললেন, ‘কোন সমস্যা নেই,তুমি এখনই চলে আসো।’

আমাদের বাসা থেকে কয়েকশ কদম হাঁটলেই আকিব ভাইদের বাসা।উনাদের বাসায় কয়েকটা পথে যাওয়া যায়।তবে সবচেয়ে কম দূরত্বের পথ দিয়ে গেলে, মধ্যপথে একটা বিরাট মসজিদের দেখা মিলে।কনকনে শীতের রাত, ঘড়িতে সময় তখন এগারটা বেজে ত্রিশ মিনিট। দ্রুত যাওয়ার জন্য মসজিদের পথ দিয়ে রওনা হলাম। সাধারণত শহরের রাস্তায় রাত বারটার পরেও অনেক পথচারী থাকে।কিন্তু শীতের রাত হওয়ায় রাস্তায় মানুষের আনাগোনা খুবই কম। হাঁড়কাঁপা শীতে হাঁটতে হাঁটতে মসজিদের সীমানা পেরিয়ে যখন কবরস্থানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ………..একটি কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। ইঁ.. ইঁ..ইঁ..। কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম।সাথে সাথে শরীরের পশম গুলো দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলো।তবে কান্নার শব্দটা ঠিক কোন দিক থেকে আসছে তা বুঝতে পারছিলাম না। তখন আর ডানে বামে না তাকিয়ে আরো দ্রুত গতিতে হাঁটতে শুরু করলাম।কিন্তু যতই দ্রুত হাঁটি না কেন পথ যেন শেষই হচ্ছে না।

কবরস্থানের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে একটা বড় খাল।এই খাল দিয়ে চারপাশের সব এলাকার ময়লা আবর্জনা নদীতে গিয়ে মিশে।খালের উপর কংক্রিটের ব্রীজ।ব্রীজ পার হয়ে এক দৌড়ে আকিব ভাইদের বাসায় গিয়ে পোঁছালাম। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বেশ কয়েকবার কলিংবেল দিলাম।কিন্তু কারো কোনো সাড়াশব্দ নেই।অনেক্ষণ পর হঠাৎ, দরজার ভেতর থেকে আকিব ভাইয়ের মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে?’ পরিচয় না দিয়েই, পাল্টা প্রশ্ন করলাম। ‘আন্টি আকিব ভাই আছে?’ পরিচয় দিলেও আন্টি আমাকে চিনবে না। কারণ, আগে কখনো আমাদের দেখা হয়নি। তারপর আন্টি বললেন, ‘আকিব ছাদের ঘরে।’

আকিব ভাইদের ছাদে মুগ্ধ করার মতো একটি চিলেকোঠা রয়েছে।সেখানে আকিব ভাই থাকেন।দিনের বেশিভাগ সময় উনি চিলেকোঠায় কাটান।এটি ছাদের পূর্বপাশে,আর দক্ষিণ পাশে রয়েছে বাথরুম,বাথরুমের পাশে একটি বিরাট পানির টাংকি।চিলেকোঠায় পশ্চিমমুখী দরজা।দরজার বাহিরের দুপাশে এবং উপরের দিক থেকে টবে ঝুলে আছে হরেক রকমের উদ্ভিদ। আকিব ভাই খুবই উদ্ভিদ প্রেমিক।উনার চিলেকোঠায় গেলে মুহুর্তের মধ্যে যে কেউ বুঝতে পারবে সেটা।রুমের ভেতরেও টবে কিছু গাছ আছে।থাকার জন্য পূর্ব পশ্চিম করে একটি সিঙ্গেল খাট রয়েছে।উত্তর দক্ষিন দুপাশের দেওয়াল জুড়ে বইয়ের তাক। তাক গুলো বিভিন্ন লেখকের বই দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজানো। তাকের উপরে নিচে, যেসব জায়গা খালি ছিল সব জায়গা জুড়ে রয়েছে নজর কারার মতো ছোট ছোট কিছু তৈলচিত্র। রুমের এক কোণায় রয়েছে ছোট একটি টেবিল, তার উপর কিছু কাগজপত্র ও একটি ল্যাপটপ। পুরো রুমটা অনেক পরিপাটি, যেন এক কল্পনার রাজ্য।
রুমের একটি মাত্র জানালা, তাও পূর্ব দিকে। জানালার ভেতরে বাহিরেও অনেক গুলো টব ঝুলানো। আর তাই, রৌদ বৃষ্টি ঝড়ে কখনও জানালাটা বন্ধ করা হয় না।উনার চিলেকোঠায় পাতাবাহার, গাঁদাফুল , মেহেদী, লেবু, মরিচ, পুদিনাপাতা, ব্রোকলি, ক্যাপসিকা, মণিরাজ, মাধবীলতা, ক্যামেলিয়া, নাইটকুইন ছাড়াও বছরে একবার ফোটা দুর্লভ ফুল মে ফ্লাওয়ার গাছ ও দেখা যায়।

ছাদ খুবই অন্ধকার।চিলেকোঠার দরজার ফাঁক দিয়ে কিছু আলো এসে পড়েছে টবে থাকা গাছ গুলোতে।তারাহুরো করে দরজায় টোকা দিতে গিয়ে মাথা ঠুকলো একটা টবের সাথে। তৎক্ষণাৎ উুঁ করে চিৎকার করে উঠলাম। তখন আমার চিৎকার শুনে আকিব ভাই রুম থেকে বের হয়ে এলেন।
আকিব ভাই আর উনার খালাতো ভাই সজিব, দুজনে বসে বসে ল্যাপটপে মুভি দেখতেছিল। কিচ্ছুক্ষণ পর মুভি দেখা শেষ হলে, আকিব ভাই বললেন, ‘রাতে তোমাকে একা থাকতে হবে।আমি আর সজিব দোতলায় থাকবো। তাছাড়া চিলেকোঠায় একজনের বেশি থাকার জায়গা হবে না।’
তারপর যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করলেন, ‘একা থাকলে ভয় টয় পাবা নাতো?’ এতোবড় ছেলে যদি বলি ভয় পাবো তাহলে তা লজ্জার ব্যাপার, এমন চিন্তা করে জবাব দিলাম, ‘ না ভাই, কোন সমস্যা হবে না।’
বাহিরে শীত পড়ছিল ভীষণ, কনকনে ঠান্ডা বাতাস। বাতাসে বরফ ঝরছিল যেন। তো,উনারা চলে যাওয়ার পর আর দেরি না করে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। আসার সময় যে অদৃশ্য কান্নার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম তখন তা আর তাদের বলা হয়নি।

গভীর রাতে হঠাৎ ইঁ.. ইঁ..ইঁ.. কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো।রাতে আসার সময় রাস্তায় যে কান্নার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম, ঠিক সেই একই শব্দ। মেয়েলী কন্ঠের কান্না।মনে হচ্ছিলো জানালার পাশে বসে কেউ একজন বিরতিহীন ভাবে কেঁদেই যাচ্ছে।লক্ষ্য করলাম, ভয়ে আমার শরীরের প্রত্যেকটা লোমকূপ দিয়ে ঘাম বের হচ্ছে।পেটে মোচড় শুরু হয়েছে।এর মধ্যে আবার ছোট প্রকৃতির ডাক । ঝামেলা যে মহা! উফ্ আর সময় পেলো না! তখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলাম।এসে লাইট অফ করে যখন আবার কম্বল মুড়ি দিতে যাবো, তখন কৌতুহলী মনে ইচ্ছে হলো একবার জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখার ; কান্নার শব্দটা ঠিক কোথায় থেকে আসে। একরাশ ভয় নিয়ে জানালায় ঝুলন্ত টবের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে যা দেখলাম, তার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।পাশের দোতালা বাড়ির ছাদের এক কোণায়, সাদা কাপড় পরিহিত একটি মহিলা বসে বসে কাঁদছে।মাথায় লম্বা ঘোমটা, তাই চেহারা দেখা যাচ্ছেনা , কোলে একটি বাচ্চা।দেখার সাথে সাথে আমি সেন্সলেস হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আকিব ভাইদের বাসার সবাই আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।
পরে আকিব ভাই থেকে জানতে পারলাম, কয়েক বছর আগে পাশের দোতলা বাড়িটি এক দম্পতির কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল।তাদের মধ্যে সবসময়ে পারিবারিক কলহ লেগে থাকতো।তো একদিন ঝগড়া করতে করতে স্বামী তার গর্ভবতী স্ত্রী’কে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছিল। তখন সেই মহিলার লাশ মসজিদের পাশের কবরস্থানে দাফন করে।এরপর থেকে মাঝেমধ্যে অনেকেই এই রাস্তা দিয়ে আসার সময় এবং বাড়িটির আশেপাশে একটা মহিলাকে কান্না করতে দেখে।আর এইজন্য বাড়িটিতে কোনো ভাড়াটিয়া এক দুই মাসের বেশি থাকে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *