মাথা কাটা গুজব, পদ্মাসেতু এবং বাংলাদেশ

ফিচার লাইফ স্টাইল

Sharing is caring!

কামরুল নাজিম:
বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয় বাংলা ছায়াছবি ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ এর একটি দৃশ্য ছিল এমন। নায়ক আরেফিন শুভ এবং তাঁর বন্ধু তাদের পুরনো এলাকায় ফিরে গান শেখানোর জন্য বাচ্চা খুঁজতে লাগলে এলাকার লোকজন তাদেরকে চিনতে না পেরে ছেলেধরা বলে ধাওয়া দেয়। এই দৃশ্যটি দেখে হাসি আটকানোর আসলেই কোন সুযোগ ছিল না। সে যায় হোক, সিনেমার গল্প করা আমার উদ্দেশ্য নয়। প্রিয় পাঠক, এই সিনেমা থেকে যে টার্মটি আমি ধার নিলাম সেটি হল ‘ছেলেধরা’। আমি বরং আমার শৈশবের গল্প বলি। আমাদের শৈশব মানে সেই নব্বইয়ের দশকের শেষ শেষ এবং নতুন একটি শতাব্দীর শুরুর সময়টা। আমাদের তখন স্কুল যাওয়ার সময়৷ সেই সময়টাতেই আমরা এক আগন্তুক ভয়ের সাথে পরিচিত হই। ভয়টির নাম হচ্ছে ‘কল্লাকাটুনি’। এই কল্লাকাটুনি মানে হল মাথা কেটে নিয়ে যাওয়া। পরিবার থেকে সমাজ এবং বিদ্যালয় সব পরিবেশেই আমরা এই ভয়ের সাথে পরিচিত হতে থাকি। এবং সেই কল্লাকাটুনি লোকের বিবরণও আমরা পেয়ে যাই। সেই লোকটি হবেন খুব অপরিচিত, মাথা হবে উষ্কুখুষ্কু, মুখমন্ডল হবে খুবই সন্দেহজনক। কিংবা লোকটি হতে পারেন পরিপাঠি একজন সুন্দর মানুষও। কিন্তু তার হাতে কিংবা তার চারপাশে একটি বস্তা থাকবে যেটিতে তিনি মাথা কেটে ভরে ফেলবেন এবং নিয়ে চলে যাবেন। এর ফলে যেটা হল, আমরা আর একা একা কোথাও যাই না। দলবেঁধে স্কুলে যাই, দলবেঁধে সকালে আরবী পড়তে মক্তবে যাই, দলবেঁধে খেলি, দলবেঁধে হাঁটি।। হয়তো কোন ঝোপঝাড়ের পাশে কোন লোক দাঁড়িয়ে আছেন কিংবা রাস্তার মাথায় দাঁড়ানো কোন অপরিচিত ব্যক্তি; যিনি হয়তো নিতান্তই একজন ভদ্রলোক, কিন্তু সেই কল্লাকাটুনি নামক এক আরোপিত ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত আমরা সেই অপরিচিত ব্যক্তিকে দেখামাত্রই এক দৌঁড়ে বাড়ি চলে আসতাম। তারপর আস্তে আস্তে বড় হলাম আর জানতে পারলাম এই কল্লাকাটুনি নিছকই একটি ভয় এবং কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। কল্লাকাটুনির ভয় নিয়ে প্রাথমিক শেষ করতে না করতেই আমরা বুঝতে লাগলাম এই কল্লাকাটুনি মূলত ছেলেধরা। কোথাও একটা নতুন কালবার্ট হলো, কিংবা কোথাও একটা নতুন বিল্ডিং, কোথাও কোন মোবাইল কোম্পানীর টাউয়ার বসানো হবে, কোথাও একটা নতুন পুকুর খনন করা হল, সুতরাং সেখানে নাকি বাচ্চাদের মাথা লাগবে। এবং আরো ভয়ঙ্কর যে ব্যাপার, সে সন্তানটি হতে হবে বাবার একমাত্র সন্তান। রীতিমত একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তো সর্বত্রই। এবং তখন প্রায়ই শুনতাম অমুক জায়গায় বাচ্চা ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় দু’জনকে মানুষ ধরে ফেলেছে। আমরা যার কাছ থেকে এটা শুনতাম, সেও আরেকজনের কাছ থেকে শুনতো, সেই সেও আরেকজনের কাছ থেকে শুনতো। এভাবে সবাই কেবল শুনতো, কেউ আর নিজ চোখে দেখতো না। আমাদের শৈশবের সেই সময়টাতে প্রযুক্তি এত আধুনিক ছিল না। এত মিডিয়া, স্যোশাল মিডিয়া, ইন্টারনেটের যুগও সেটি ছিল না। এবং বাংলাদেশে শিক্ষার হারও তখন এত বেশী ছিল না। গ্রামগঞ্জে তো তখন শিক্ষিত মানুষ হাতেগণা ছিল কয়েকজন। যার ফলে এইসব কুসংস্কার মানুষ খুব বিশ্বাস করতো এবং এসব গুজব খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়তো। সেই শৈশব পেরিয়ে, মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে আমরা যখন দেখি আমাদের শৈশবের দিনগুলো হারিয়ে গেলেও সেই সময়ের গুজব, কুসংস্কার এখনো চলমান; তখন পেটভরা হাসি আসে বৈকি। আসবেই তো। এই বাংলাদেশ তো এখন সেই বাংলাদেশ নেই আর। এখন প্রযুক্তি আরো উৎকর্ষ হয়েছে, মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে গেছে ইন্টারনেট সেবা, এই মিডিয়া সেই মিডিয়া করে যোগাযোগ এখন কত সহজ হয়ে গেছে। তারচেয়ে বড় বিষয়, শিক্ষার হার সর্বত্রই এখন বেড়েছে। শহর কি গ্রাম; সর্বত্রই মানুষ এখন সচেতন হয়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ। তাহলে এখনো এসব গুজব কেন রটে যায়? কেন মানুষ এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করে এখনো? কারা রটিয়ে দেয় এসব গুজব? কেন দেয়? কোন কুচক্রী মহল ইচ্ছে করে করছে না তো এসব? এমন অনেক অনেক প্রশ্ন ঘুরে মাথার ভিতর। সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগেই ঘটতে থাকে ভয়ঙ্কর সব ঘটনা। এমন এক একটি গুজব রটার পরপরই আমরা শুনতে পাই দেশের অমুক জায়গায়, তমুক জায়গায় ছেলে ধরা সন্দেহে দু’জনকে, চারজনকে গণপিঠুনি দিয়েছে উত্তেজিত জনতা। এবং আরো বীভৎস্য বিষয় হল কোথাও কোথাও গণপিঠুনিতে এসব সন্দেহভাজন লোকদের মৃত্যুও হয়। ভাবা যায়! একটা গুজবে কান পেতে (বাস্তবে যার কোন অস্তিস্তও নেই) মানুষ সন্দেহভাজন মন থেকে পিঠিয়ে নিরাপরাধ দু’জন তিনজন মানুষকে মেরে ফেলতেছে। তাহলে কোন উদ্দেশ্যে এসব গুজন রটানো হচ্ছে? গুজবই কি আমাদের প্রিয় স্বজন? নিকট অতীতেও দেশের প্রত্যেকটা ইস্যুতেই এমন নানারকম গুজব রটানো হয়েছে। একাত্তরেও এমন গুজব রটানো হয়েছিল। তারও অনেক আগে মধ্যযুগেও আমাদের এই প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে হিন্দুদের ভাষা বলে গুজব রটানো হয়েছিল। সেই সময়ের কবি আব্দুল হাকিম রেগেমেগে এসব দুষ্কৃতিকারীর জন্মপরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। এবং সর্বশেষ পদ্মাসেতু ইস্যুতে লক্ষাধিক মাথা লাগবে বলে গুজব রটিয়ে দেয়া হল। আর এই গুজব রটাতে ব্যবহার করা হল প্রযুক্তির সর্বোৎকৃষ্ট আবিষ্কার স্যোশাল মিডিয়াকে। এবং এর ফলে যেটা হওয়ার কথা ছিল ঠিক সেটাই হল। জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো, এখানে সেখানে ছেলেধরা সন্দেহে দু’চারজন মানুষকে ধরে ধরে গণপিঠুনি দেয়া শুরু হল এবং এসব ছেলেধরা লোকেরা সরকারী লোক বলে গণপিঠুনি দিতে আবার মানুষকে উৎসাহও দিতে লাগলো একটা পক্ষ। সর্বশেষ দু’তিনদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমন দু’তিনজন মানুষকে সন্দেহভাজন হিসেবে ধরে গণপিঠুনি দেয়া হল, আর তারপরই জানা গেল এই লোকগুলো আসলে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ ছিল। পদ্মাসেতু আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। কাজ শুরু হওয়ার আগে থেকেই এই প্রকল্প নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হল। সকল প্রতিকূলতাকে পিছনে ফেলে যখনই এই সেতু আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হতে শুরু করলো, তখনই আমাদের কোন কোন ব-কলম রাজনীতিবিদ জনগণকে আহবান করে বললেন, ‘এই সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। আপনারা এই সেতুতে উঠবেন না।’ এখন এই প্রকল্প যখন আরো অধিক দৃশ্যমান হয়ে উঠলো, তখন রটিয়ে দেয়া হল এই সেতুর পিলার বারবার নড়ে যাচ্ছে, পিলার ঠিক রাখার জন্য দশলক্ষ মাথা লাগবে।

তাহলে এটা কি সরকারবিরোধী মহলের কাজ? সরকারেরর সফলতাকে জনমনে ব্যর্থতায় রুপান্তর করতে কোন মহল কি ইচ্ছে করেই এমনটা করছে? পদ্মাসেতু হোক, বাংলাদেশ সামনের দিকে অগ্রসর হোক, এটা কি তারা মানতে পারছে না? কেন মানতে পারছে না? এই জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তির যুগেও কেন তারা গুজবের উপর ভর করে চলছে? সরকারের উচিত অবশ্যই এসব গুজব রটনাকারীদের শনাক্ত করে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা। আর যদি সত্যি সত্যি পদ্মাসেতুর জন্য মাথা প্রয়োজন হয়, তাহলে গুজব রটনাকারী এসব মাথাগুলোই পদ্মাসেতুতে দিয়ে দেয়া হোক। এত অকেজো, নষ্ট মাথা দিয়ে কী করবে বাংলাদেশ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *