হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের চুম্বক অংশ

জাতীয়

Sharing is caring!

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্ত থেকে অসুস্থ ছিলেন। গত ২২ জুন থেকে ৯০ বছর বয়সী এরশাদ ছিলেন সিএমএইচে চিকিৎসাধীন।ঘটনার সমারোহে আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের শীর্ষে থাকাদের অন্যতম সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা হিমোগ্লোবিন স্বল্পতা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন।

এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলায় জন্মগ্রহণ করেন । সেখানে ও রংপুরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৬০-৬২ সালে তিনি চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন। তিনি ১৯৬৮ সালে শিয়ালকোটে ৫৪তম ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯-৭০ সালে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এবং ১৯৭১-৭২ সালে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন এরশাদ। মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালিরা যখন ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসে তখন এরশাদও প্রত্যাবর্তন করেন। পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭৩ সালে এরশাদকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল নিয়োগ করা হয়। তিনি ১৯৭৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কর্নেল পদে এবং ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। একই বছর তিনি ভারতের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রতিরক্ষা কোর্সে অংশগ্রহণ করেন। ওই বছরই আগস্ট মাসে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদকে সেনাবাহিনী প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই সংবাদপত্রে বিবৃতি ও কভারেজের মাধ্যমে রাজনীতিতে এরশাদের আগ্রহ প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন।

এরশাদ ১৯৮৪ সালে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা পদ্ধতির প্রচলন করেন। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের মধ্যে ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে আয়োজিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরশাদ তার জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পাঁচ বছর মেয়াদকালের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এর আগে কারচুপির মধ্যে অনুষ্ঠিত ১৯৮৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল, তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচন বর্জন করে।

রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়ে এরশাদ ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর তৃতীয় জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন আহ্বান জানান। সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী আইন পাশ করে সেদিন জাতীয় সংসদ সংবিধান পুনর্বহাল করে। এর মাধ্যমে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখলসহ সামরিক আইন ও বিধিবিধান দ্বারা সম্পাদিত সব কাজ ও পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া হয়। তবে বিরোধী দলের প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ তৃতীয় জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হন। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনও প্রধান বিরোধী দলগুলো বর্জন করে। অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে একসময় দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠন ছাত্রসমাজ বিলুপ্তির ঘোষণা দেন। বেসামরিক জীবন থেকে রাজনীতিতে এসে দল গঠন, ক্ষমতার মোহে পড়ে একসময় আখ্যায়িত হন ‘স্বৈরশাসক’ হিসাবে। দেশব্যাপী তার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

ক্ষমতা হারানোর পর এরশাদ গ্রেফতার হন এবং ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না-আসা পর্যন্ত কারারূদ্ধ থাকেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি কারাগার থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। বি.এন.পি সরকার তার বিরুদ্ধে কয়েকটি দুর্নীতি মামলা দায়ের করে। তার মধ্যে কয়েকটিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং সাজাপ্রাপ্ত হন। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। ছয় বছর আবরুদ্ধ থাকার পর ৯ জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান। ২০০০ সালে জাতীয় পার্টি তিনটি উপদলে বিভক্ত হয়। বর্তমানে এরশাদ একটি অংশের চেয়ারম্যান।

২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসনে জয়ী হয়। এরপর তিনি ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের সাথে মহাজোটে যোগ দেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল ২৭টি আসনে বিজয়ী হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম ও ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেয় জাতীয় পার্টি। দলটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকায় দশম সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করে, আবার জাতীয় পার্টির এমপিরা সরকারের মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

এরশাদের রাজনৈতিক শাসনামল নিয়ে কথা উঠলেও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায় ‘স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা পদ্ধতি’র। বিশেষত উপজেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকার কারণে এরশাদের অনুসারীরা তাকে ‘পল্লীবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত করেন।

১৯৮২ সালে স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ পুনর্গঠন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এরপর ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০টি ধাপে ৪৬০টি থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।
এরশাদের বিরুদ্ধে রাডার ক্রয় মামলা ও মঞ্জু হত্যা মামলা দুটো এখনো বিচারাধীন।

ব্যক্তি জীবনে এরশাদ দুটি বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। প্রথম স্ত্রী হচ্ছেন বর্তমান বিরোধী দলীয় সংসদ উপনেতা রওশন এরশাদ, যার সঙ্গে এরশাদ ১৯৫৬ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দ্বিতীয় জন সাবেক স্ত্রী বিদিশা এরশাদ। এরশাদ-বিদিশার ঘরে এরিক নামে এক পুত্র রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *