বহুমাত্রিক শিল্পের স্রষ্টা হুমায়ুন আহমদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা

ফিচার বিশেষ দিন

Sharing is caring!

“মৃত্যু যে ঘটবেই তা কিন্তু আমরা সবাই জানি। তারপরেও মৃত্যু যখন ঘটে তখন কিন্তু আমরা খুবই বিস্মিত হই।” জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, নির্মাতা ও গীতিকার হুমায়ূন আহমেদের আজ ৭ম মৃত্যু বার্ষিকী। ২০১২ সালের আজকের এই দিনে হাজারো ভক্তকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বিখ্যাত কলম জাদুকর, হাজারো চরিত্রের স্রস্টা।

বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। গীতিকার, নাট্যকার, নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি সমাদৃত।

জীবনযাপনে আপাদমস্তক বাঙালির মনের দরজায় টোকা মারা মানুষটিই সবার প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ। নুহাশপল্লীতে রাত জেগে ‘ভূতের সন্ধান’ লেখায় কিংবা কখনও বেশ রহস্যময়, আবার কখনও চিরাচরিত সাধাসিধে বাঙালি।

মিসির আলী, হিমু ও শুভ্রদের বসবাস যেন তাকে ঘিরেই। দুই বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকটির লেখা পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। বড় অসময়ে চলে যাওয়া এই মানুষটি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে জন্মেছিলেন। ছোটবেলায় বাবার নামের সঙ্গে মিল রেখে রাখা হয়েছিল নাম। পরে তিনি নিজেই তার নাম পরিবর্তন করেন।

অতুলনীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তিনি ঢাকার অদূরে গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে নীরব জীবনযাপন করতেন। মাঝে মাঝে ঢাকায় আসতেন প্রয়োজনীয় কাজ সারতে। লেখালেখি এবং নাটক-চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি সাহিত্যিক থেকে জনপ্রিয় নাট্যকার, পরিচালক ও চলচ্চিত্রকারের তকমা গায়ে মাখান।

হিমু, মিসির আলী, শুভ্র তার সৃষ্ট সাহিত্যিক চরিত্র। এগুলো অসম্ভব জনপ্রিয় এখনও। মধ্যবিত্তের জীবনের রোজনামচা নিয়ে তিনি যেমন সাহিত্য রচনা করেছেন, তেমন নির্মাণ করেছেন নাটক ও চলচ্চিত্র। তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশ হয় ১৯৭২ সালে। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে।

আর তার শেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’ ২০১২ সালে এবং শেষ পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ মুক্তি পায় ২০১২ সালে। তার প্রতিটি সৃষ্টিকর্মই ভক্তদের বিনোদিত করেছে। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, কুটু মিয়া, মধ্যাহ্ন, কৃষ্ণপক্ষ, গৌরীপুর জংশন, ময়ূরাক্ষী, হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম, সে আসে ধীরে, অন্যভুবন, আমিই মিসির আলীসহ অনেক পাঠকপ্রিয় সাহিত্য রচনা করেছেন তিনি।

এসব দিনরাত্রী, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত, অয়োময়সহ বহু নাটক নির্মাণ করেও আনন্দ দিয়েছেন দর্শকদের। কথার জাদুকরখ্যাত হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে এক ভিন্ন রকমের কথা বলার ধরন। ‘আপনার কি বিবাহ হয়েছে, অবশ্যই যাব কেন যাব না, কী আচানক কারবার, আপনাকে চড় দেইসহ নানা ধরনের সংলাপ তার লেখায় ব্যবহার বা চিত্রে উপস্থাপন করেছেন।

বহুমাত্রিক সৃষ্টির জন্য নানা পুরস্কারে ভূষিত হন হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি লেখক শিবির পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, শিশু একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পদক, কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক লাভ করেন।

১৯৯২ সালের শঙ্খনীল কারাগার চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার বিভাগে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ভাষা ও সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে একুশে পদক অর্জন করেন।একই বছরের ‘আগুনের পরশমণি’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার ও শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতার তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। তার উপন্যাস অবলম্বনে তৌকীর আহমেদ নির্মিত ‘দারুচিনি দ্বীপ’ (২০০৭) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

তার উপন্যাস অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলাম নির্মিত ‘অনিল বাগচীর একদিন’ (২০১৫) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে মরণোত্তর শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতার পুরস্কার লাভ করেন।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে এই নন্দিত লেখক পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।

মহান এই জাদুকরের জন্য সিনিউজের পক্ষ থেকে রইল গভীর শ্রদ্ধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *