সুদীপ্ত হত্যায় মূল পরিকল্পনাকারী বড় ভাইয়ের নাম ফাঁস

অপরাধ চট্টগ্রাম মহানগর প্রচ্ছদ

Sharing is caring!

অবশেষে চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী কথিত বড় ভাইয়ের নাম প্রথমবারের মতো ফাঁস হয়েছে। এ মামলায় ইতোপূর্বে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের প্রত্যেকেই কৌশলে বড় ভাইয়ের নাম এড়িয়ে গিয়েছিল প্রদত্ত জবানবন্দিতে। কিন্তু এইবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নাম ফাঁস করেছেন আসামি মিজানুর রহমান।

জবানবন্দিতে জানান, সুদীপ্ত হত্যাকাণ্ডের কারণ, পরিকল্পনাকারী, পূর্ব প্রস্তুতি এবং ঘটনার পরবর্তী জড়িত সকলের অবস্থান প্রসঙ্গে। পুরো ঘটনার পরিকল্পনাকারী লালখান বাজার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম। গত শুক্রবার সুদীপ্ত হত্যা মামলার আসামি মিজানুর রহমান মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার জাহানের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব জানান।

আদালতে প্রদত্ত জবানবন্দীতে আসামি মিজানুর রহমান জানান, তিনি লালখান বাজারের দিদারুল আলম মাসুমের রাজনৈতিক কর্মী। তিনি এলাকায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতি তিনজন আলাদা আলাদা ব্যক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি বলেন, মাসুম ভাইয়ের নির্দেশে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করতেন আইনুল কাদের নিপু। যুবলীগ নিয়ন্ত্রণ করতেন পিচ্চি হানিফ। স্বেচ্ছাসেবক লীগ নিয়ন্ত্রণ করতেন ওয়াসিম উদ্দিন।
ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর রাত দশটা/সাড়ে দশটার দিকে আসামি মিজানুর মতিঝর্ণা এলাকায় একটি টং দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন। এসময় পিচ্চি হানিফ এসে তাকে বলেন, মাসুম ভাইয়ের অফিসে কাজ আছে, চল আমার সাথে। তারা দুজন মাসুমের অফিসে যান। পিচ্চি হানিফ তাকে ভাত খেতে দিয়ে মাসুমের অফিস রুমে প্রবেশ করেন। ভাত খাওয়ার সময় তিনি সেখানে পিচ্চি হানিফ ছাড়াও আইনুল কাদের নিপু, ওয়াসিম ও দিদারুল আলম মাসুমকে দেখেন।

মিজানুর খাওয়া শেষে মাসুমের অফিসের বাইরে একটি বেঞ্চিতে বসেছিলেন। ৩০ মিনিট পর অফিস রুম থেকে বের হন মাসুম, নিপু, ওয়াসিম ও পিচ্চি হানিফ। মিজানুর বলে, মাসুম ভাই জানতে চায় আমি ভাত খেয়েছি কিনা। মাসুম ভাই আমাকে বলেন, আগামীকাল সকাল ৬টার মধ্যে লালখান বাজার কর্নেল হোটেল মোড়ে চলে আসবি, কাজ আছে। নিপুদের সাথে যাবি।

পরদিন অর্থাৎ ৬ অক্টোবর ভোর ৬টা থেকে ৬টা বিশের মধ্যে আমি কর্নেল হোটেল মোড়ে চলে আসি। সেখানে নিপু, ওয়াসিম, পিচ্চি হানিফ ও মোক্তারকে একটি বেঞ্চিতে বসে থাকতে দেখি। এছাড়া লাল গেঞ্জি পরিহিত জাহেদকে একটি মোটর সাইকেলের উপর বসে থাকতে দেখতে পান। ওখানে ১০/১২টা সিএনজি টেঙি দাঁড়ানো ছিল। সেগুলোতে ৪০/৫০ জন রাজনৈতিক কর্মী বসা ছিল। এদের মধ্যে নওশাদ, তার ভাই আরমান, পাপ্পু, বাপ্পী, খায়ের ও বাবু ছাড়া অন্য কাউকে চিনি না। নিপু ভাই আমাকে একটা সিএনজি টেঙিতে তুলে দিয়ে বলে, তুই এদের সাথে যা। আমার নির্দেশ ছাড়া কেউ সিএনজি থেকে বের হবি না। সবাইকে যার যার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।

১০/১২টা সিএনজি টেঙির সামনে ২/৩টা মোটর সাইকেলও ছিল। তাদের মধ্যে আমি শুধু মোক্তার ও জাহেদকে দেখেছি। বাকিদের চিনি নাই। আমরা সকাল ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থল নালাপাড়ায় গলির একটু ভেতরে গিয়ে অবস্থান নিই। নিপু ভাই আমাদেরকে বলে সিএনজিগুলো ঘুরিয়ে রাখতে। ঘটনার পর বুঝতে পারি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করার জন্য সিএনজিগুলো ঘুরিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল।

হঠাৎ দেখতে পাই আমার সামনের ও পেছনের সিএনজিগুলো থেকে ৬/৭ জন ছেলে লোহার রড ও পাইপ নিয়ে গলির ভেতর দৌড়ে যাচ্ছে। নওশাদের ভাই আরমান আমাদের সিএনজির সামনে এসে বলে, আমাকে পাইপটা দে। আমাদের সিএনজিতে দুই থেকে আড়াই ফুট লম্বা একটি লোহার পাইপ ছিল। পাইপ যে ছিল তা আমি জানতাম না। আমি সিএনজির পেছন থেকে পাইপটা বের করে আরমানের হাতে দেই। ২/৩ মিনিট পর হট্টগোলের শব্দ এবং এক রাউন্ড ফাঁকা গুলির শব্দ শুনি। ২/৩ মিনিটের মধ্যে নিপু, খায়ের, ওয়াসিম, মোক্তার, পিচ্চি হানিফ, বাবু, বাপ্পী, নওশাদ, আরমান, পাপ্পুকে দৌড়ে গলির ভেতর থেকে বের হয়ে আসতে দেখি। নিপুর গলার আওয়াজ শুনতে পাই। নিপু বলছিল, সবাই সিএনজিতে উঠে যা। এরপর আমরা লালখান বাজার মোড়ে এসে যে যার মতো চলে যাই।

পিবিআই সূত্র জানায়, সুদীপ্ত খুনের ঘটনায় বড় ভাইসহ ১৫-১৬ জনের নাম এসেছে। ভিডিওতে ধারণ করা পেটানোর দৃশ্যে নওশাদ সাদা শার্ট পরিহিত, ফয়সল নীল গেঞ্জি, শিপন নীল-সাদা গেঞ্জি পরিহিত ছিলেন। ভিডিওটি মোক্তারের আইফোন থেকে পুলিশ সংগ্রহ করেছে। ইতোপূর্বে পাপ্পুর জবানবন্দীতে বড় ভাই প্রসঙ্গটি আসে। কিন্তু বড় ভাইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়নি। মিজানুরের জবানবন্দীতে প্রথম প্রকাশ পেল বড় ভাইয়ের নাম।
প্রসঙ্গত, ইতোপূর্বে এ মামলার অপর এক আসামির কল রেকর্ড থেকে বড় ভাইয়ের নাম পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে ধারণ করা ভিডিও ও মামলার নথিপত্র (কেস ডকেট) ধরে জড়িতদের চিহ্নিত করার কাজ প্রায় শেষ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পেটানোর ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সুদীপ্ত মারা যান। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্ত্রাসী এবং গডফাদারের নাম ও পরিচয় পেয়ে গেছে তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই। পিবিআই বলেছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে।

২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর সদরঘাট থানাধীন নালাপাড়ার বাসায় হানা দিয়ে সুদীপ্তকে ঘুম থেকে তুলে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসে সন্ত্রাসীরা। এরপর তাকে কয়েকজন সন্ত্রাসী বেদম পেটায়। মেডিকেলে নেওয়া হলে সুদীপ্তকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

মিজানুর আরো জানান, ঘটনার আগের দিন রাতে নিপু মাসুম ভাইয়ের অফিস থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় মাসুম ভাই তাকে বলছিল, ঘটনাটা সকাল ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে শেষ করবি। ৮টার পর আমি ঘুমাতে যাব। মাসুম ভাই নিপুকে আরো বলেন, ঘটনাটা মোক্তারকে ভিডিও করে আনতে বলবি, আমি দেখব। যখন মাসুম ভাই নিপুকে কথাগুলো বলছিল, আমি তখন ২/৩ হাত পেছনে ছিলাম। তখন মাসুম ভাই, নিপু, ওয়াসিম, হানিফ সবাই একসাথে আমার সামনে দিয়ে হাঁটছিল।
ঘটনার পর সেদিন দুপুরে টিভিতে খবর দেখে বুঝতে পারি আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সুদীপ্তকে মারার জন্য। আমি সুদীপ্তকে আগে থেকে চিনতাম না। টিভিতে খবর দেখেই আমি প্রথমবারের মতো সুদীপ্ত সম্পর্কে জেনেছিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *