রিয়াদ মাহরেজের আকাশ ছোঁয়ার গল্প

খেলাধুলা

Sharing is caring!

জাবেদ হোসাইন জুহিন:

রিয়াদ মাহরেজ একজন স্বপ্নবাজ ফুটবলারের নাম। যার জন্ম ফ্রান্সের সারসেলেসে। আলজেরিয়ান বাবা আর মরোক্কান মায়ের ঘর আলোকিত করে ১৯৯১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তার জন্ম হয়। ছোটবেলা থেকে ফুটবলের প্রতি মাহরেজের ছিলো অপার টান। হয়তো ফুটবলার বাবার ঘরে জন্ম হওয়ায় ফুটবলের প্রতি তার টান ছিলো একটু বেশি। তার বাবা আহমেদ মাহরেজ আলজেরিয়া এবং ফ্রান্সের অপেশাদার কয়েকটি ক্লাবে খেলেছিলেন। মাহরেজ মাত্র ছয় বছর বয়স থেকে বাবার সাথে মাঠে যেতেন ফুটবল খেলতে। তখন থেকে মাহরেজের একমাত্র অনুপ্রেরণা ছিল তার বাবা। কিন্তু মহারেজের বয়স যখন মাত্র পনের, তখন তিনি জীবনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা মোকাবেলা করেন। হঠাৎ একদিন হার্ট অ্যাটাকে তার বাবা মারা যান।এরপর মহারেজ ও তার পরিবারের সামনে নেমে আসে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত।

কিন্তু, থেমে যাননি মাহরেজ। তার বাবা স্বপ্ন দেখতেন ছেলে একদিন অনেক বড় ফুটবলার হবে। দেশের হয়ে খেলবে। দেশের জন্য ট্রপি নিয়ে আসবে। আর বাবার এসব স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে লক্ষ্যে অটুট থাকেন মাহরেজ। জায়গা করে নেন সারসেলেস ক্লাবের বি দলে।তখন দৈহিক গঠনে ছোট এবং পাতলা স্বাস্থ্যের কারণে মূল দলের নজরে আসতে পারেননি। কিন্তু মহারেজ মরিয়া হয়ে থাকতেন সিনিয়র দলে সুযোগ পেতে। তাইতো, ক্লাবের ইনডোর গ্রাউন্ডে গভীর রাত পর্যন্ত ট্রেনিং শুরু করলেন। তার এই কঠোর পরিশ্রম বৃথা যায়নি। অল্প কিছুদিনের মধ্যে জায়গা করে নেন সারসেলেস মূল দলে। সেদিন খুশিতে ১৮ বছর বয়সী এই তরুনের দুচোখ জুড়ে নামে জলধারা। তারপর পাঁচ বছর সারসেলেসের যুবদলে খেলেছেন। কিন্তু ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি ও মাত্র ৭০ কেজি ওজনের মাহরেজকে ছোটবেলা থেকেই খুব বেশি গুরুত্ব কখনো দেয়নি ক্লাবটি।

ছোটবেলায় ছুটির মৌসুমে বাবার সাথে আলজেরিয়াতে বেড়াতে যেতেন মাহরেজরা। ওই সময় বাবা মাহরেজ ও তাঁর ভাইকে শোনাতেন নিজের ফুটবল খেলার দিনগুলোর গল্প। মাহরেজরাও আলজেরিয়ার হয়ে খেলবেন, এমন স্বপ্নই দেখতেন তাঁর বাবা। বাবা যখন ২০০৬ সালে মারা যান, তখন থেকেই ফুটবলটাকে নিজের ধ্যান-জ্ঞান বানিয়ে নিয়েছেন মাহরেজ। মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, একদিন তিনি পেশাদার ফুটবলার হয়ে দেখাবেন।

সেই প্রতিজ্ঞা রাখতেই ২০০৯ সালে সারসেলেস ছেড়ে মাহরেজ যোগ দেন কুইমপারে। কিন্তু কুইমপারে ঘটে নতুন নাটক। ফ্রান্সের চতুর্থ সারির ক্লাব কুইমপারে রিয়াদ মাহরেজকে এক মাস যাবত ট্রায়াল দেওয়ার পর দলটির কোচ রোনান জানালেন মাহরেজকে সাইন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মাহরেজকে নিতে কোচ যথেষ্ট আগ্রহী থাকলেও বিপত্তি বাঁধে ক্লাবের বড় কর্মকর্তাদের মনে। তাদের মতে এরকম রুক্ষ ও খাটো এক ছেলের জন্য মাসপ্রতি ৭৫০ ইউরো খরচ করার কোন মানে হয় না। পর অবশ্য ক্লাবের কর্তা ব্যক্তিদের সাথে আলোচনায় বসে এক প্রকার জোর করেই মাহরেজকে দলে রাখলেন রোনান। কিন্তু কুইমপারের সন্দেহ তখনও কাটেনি। তাইতো ফ্রান্সের সপ্তম সারির এক ক্লাবের বি দলে মাহরেজকে কিছুদিনের জন্য লোনে পাঠিয়ে দেন।

মূলত কুইমপার ক্লাবের কর্তারা ভাবতো মাহরেজের ফুটবল প্রতিভা বিকশিত হয়েছে বাড়ির ধারের ফুটপাথে। রাস্তার ধারে প্রতিবেশী ছেলেদের সাথে বল নিয়ে কারিকুরি করার মাধ্যমে। ফ্রীকিক সহ ফুটবলের খুটিনাটি সব কিছু পারলেও ফুটবলের ট্যাকটিকাল ব্যাপার মাহরেজ একেবারে অজ্ঞ। তার উপর সে সুঠামদেহী না, মাঠে শারীরিক শক্তি প্রদানের কাজটি তাকে দিয়ে হবে না। সুতরাং তার মত প্লেয়ারকে সাইন করানো এবং প্রতি মাসে এতগুলা টাকা খরচ করা কুইমপারের জন্য বেশ ঝুকিপূর্ণ বলে মনে করে তারা। ক্লাবের এত সন্দেহ যাকে ঘিরে সেই মাহরেজের এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র ও দুশ্চিন্তায় ভুগতেন না। তার বিশ্বাস ছিল একবার সুযোগ পাওয়া গেলে হয়। ছোটবেলা হতে বয়সে বড় ছেলেদের সাথে খেলে অভ্যস্ত মাহরেজ। আত্মবিশ্বাসে ছিলো অটল।

এইভাবে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে মহারেজ চলে আসেন লেস্টার সিটিতে। লেস্টারে মাহরেজের যোগ দেয়ার ঘটনাটাও বেশ মজার। ২০১২ এর জুলাইতে একজন উইংগারের খোঁজ করছিল লেস্টার। ২২ বছর বয়সী রায়ান মেনডেসকে পরখ করতে স্কাউট স্টিভ ওয়ালস ফ্রান্সে যান। লে হার্ভে ২-১ গোলে সিজনের প্রথম ম্যাচ হেরে বসে। ম্যাচের ৭৩ মিনিটে মাহরেজকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ। কিন্তু ততক্ষণে ওয়ালসের নজর কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ওয়ালসের পরামর্শে চিফ স্কাউট ডেভিড মিলস তাকে ফলো করা শুরু করেন। মিলসের গ্রিন সিগনাল পেয়ে শেষবারের মত মাহরেজকে দেখতে ফ্রান্সে যান ওয়ালস। জোলা, দ্রগবা, এসিয়েনের মত তারকাদের চেলসিতে নিয়ে আসার কারিগর ওয়ালস আরো একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৪ এর জানুয়ারিতে সিজনের মাঝপথে ৪৫০০০০ পাউন্ডে লেস্টার সিটিতে যোগ দেন রিয়াদ মাহরেজ। লেস্টার যখন মাহরেজকে সাইন করাতে চাইল তখন অন্য কোন দলই তার প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। ফলে ফাকা মাঠে গোল দিয়ে দেয় লেস্টার। এদিকে লেস্টার সম্পর্কে মাহরেজের বিন্দুমাত্র ধারনা ছিল না। প্রথমবার লেস্টারের নাম শোনার পর সে ভেবেছিল এটি বুঝি কোন রাগবি ক্লাব, কেননা লেস্টার তখন চ্যাম্পিয়নশীপ খেলত। কিন্তু লেস্টারের সুযোগ সুবিধা চোখে দেখে মত পরিবর্তন করেন মাহরেজ। লে হার্ভের হয়ে ২০১৩-১৪ সিজনের প্রথম অর্ধেক খেলে চার গোল ছয় অ্যাসিস্ট করা উইংগার পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে- যেখানে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

এখন থেকেই শুরু রুপকথা, স্বপ্নের মত কেটে যেতে লাগল লেস্টারে দিনগুলি। ১৯ ম্যাচে ৩ গোল ও ৫ এসিস্ট করে লেস্টারকে প্রিমিয়ার লীগে উত্তীর্ণ করার পেছনে ও যে তার অবদান আছে। তবে প্রিমিয়ার লীগে জার্নিনাটা সুখকর হয় নি একদমই। ৩০ ম্যাচে মাত্র ৪ গোল আর ৩ এসিস্ট যে তার সাথে যায় না। ১৪ তম স্থানে ৪১ পয়েন্ট নিয়ে সিজন শেষ করে লেস্টার। আগের সিজনের শোধ নিতেই যেন এবারে জ্বলে উঠলেন মাহরেজ। ইপিএল ইতিহাসে “লেস্টার সিটি রূপকথা” লিখতে শুরু করলেন তারা ০ হতে আকাশ ছোঁয়া। এই সিজনে করেন ৩৪ ম্যাচে ১৭ গোল আর ১০ এসিস্ট। আক্রমণ ভাগের সঙ্গী জেমি ভারডিকে নিয়ে তুলার মত তছনছ করেছেন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ। নামিদামী ক্লাবগুলোর ট্রান্সফার মার্কেটে শত মিলিয়ন খরচ করার দিনে একরাশ হাতাশার সাগরে ডুবিয়ে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা উচিয়ে ধরেন লেস্টার সিটি। ফলস্বরূপ মাহরেজের হাতে উঠেছে প্রিমিয়ার লিগের সেরা প্লেয়ারের সম্মাননা।

মহারেজ বর্তমানে ম্যানসেস্টার সিটির হয়ে খেলছেন। সিটির হয়ে নিজের প্রথম সিজনে জিতে নিয়েছেন ডমেস্টিক ট্রেবল। ১৪ ম্যাচে গোল করেছেন ৭ টি ও এসিস্ট ৪ টি।

এই তো গেলো ক্লাব কান্ড। আচ্ছা, কে না চাই জন্মভূমির হয়ে হাত উঁচিয়ে ট্রপি মেলে ধরতে? একটাই উত্তর সকলে চাই, তবে সবার কপালে জুটে না। এবার সেটাও উচিয়ে ধরেছেন প্রয়াত ফুটবল পাগল বাবার ছেলে মাহরেজ। কয়দিন জিতছেন নিজেদের (আলজেরিয়া) ইতিহাসের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ট্রপি আফ্রিকা নেশনস কাপ। এতে হারিয়েছেন ক্লাব রাইভাল সাদিও মানের দেশ সেনেগালকে। বাবার স্বপ্ন ছিল তার ছেলে একদিন নামী ফুটবলার হবেন, হয়েছেন ও। তবে আজ বাবা পাশে নেই, তবে পরকালে নিশ্চয় খুশি আছেন ছেলের এমন কান্ড দেখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *