গরু বিষয়ক রচনা ও অন্যান্য

মতামত মুক্তচিন্তা

Sharing is caring!

সাইমুন ইফতেখার :- একখানা মজার ঘটনা দিয়ে শুরু করি। একবার স্বামী বিবেকানন্দ কোলকাতার বাগবাজারে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণে গেলেন। সেখানেই চাঁদা নিতে হাজির গোরক্ষিণী সভার এক প্রচারক। বিবেকানন্দ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মধ্যভারতে দুর্ভিক্ষে প্রায় আট লাখ লোক মারা গিয়েছে। আপনারা তাঁদের জন্য কিছু করছেন না?’ ভদ্রলোকের উত্তর, ‘না, ওটা ওঁদের কর্মফল।’ বিবেকানন্দের সটান জবাব, ‘তা হলে গরুরাও নিজেদের কর্মফলে কসাইখানায় যাচ্ছে। আমাদের কিছু করার নেই।’ নাছোড়বান্দা ভদ্রলোক বললেন, ‘কিন্তু শাস্ত্র বলে, গরু আমাদের মা।’ বিবেকানন্দের উত্তর, ‘দেখেই বুঝেছি। তা না হলে এমন কৃতী সন্তান আর কে প্রসব করবেন?’

যাহোক, গরু নিয়ে ভারতবর্ষে কম কেচ্ছাকাহিনী হয়নি। গরু রীতিমতো পলিটিকাল প্রাণীতে পরিণত হয়েছে এই মুল্লুকে। হিন্দুদের নিকট পরম পূজনীয় হওয়ার বিপরীতে মুসলমানেরা অতি সোল্লাসে গরু কেবল গরুই কোরবানী বা যবেহ করে নিজেদের সাচ্চা মুসলিম হিসেবে জাহির করার উৎসাহী প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় এই পাক-ভারত-বঙ্গাল মুল্লুকে। এটাকে আপাদমস্তকই একটা গোষ্ঠীগত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বলা যেতে পারে। হিন্দুরা যতোই গরু জবাইয়ে বাধা দেয়, মুসলমানেরা ততোই গরু জবাইয়ে জানপ্রাণ ঢেলে দেয়। অথচ মজার বিষয় হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজের জীবনে কখনো গরুর গোশত খেয়েছেন বলে হাদিস মারফত জানা যায়না। অদ্ভুত শোনালেও এটাই সত্য!

আজো আরবের দিকটায় গরুর গোশত খুব একটা জনপ্রিয় নয়। ওদিকে পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভেড়া। সম্ভবত আরবীয়রা ভারতীয়দের মতো ঝোলেঝালে গরুর গোশত রাঁধতে জানেনা। এদিকে হিন্দুসমাজের প্রবল বিরোধিতার বিপরীতে এখানকার মুসলমানেরা গরুর গোশতের অসংখ্য সুস্বাদু আইটেমের রেসিপি আবিষ্কার করে বসে আছে। কোলকাতায় বিহারীদের দোকানের গরু গোশত কিংবা কলিজাভুনা যে একবার খেয়েছে সে সেই স্বর্গীয় স্বাদ ভুলতে পারবেনা কোনোদিন।

এই যে গরুর মাংস নিয়ে এতো আলাপ করছি, চারিদিকেও এতো আলাপ, দেখে মনে হবে এই দেশের মানুষ বোধহয় শুধু মাংসই খায় দিনে তিনবেলা। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে মাথাপিছু বার্ষিক মিট কনজাম্পশন মাত্র চার কেজি। সারাবিশ্বে সবচাইতে কম মাংসাশী দেশগুলোর মধ্যে একটা আমাদের দেশ। তাও শহরের দিকটার প্রিভিলেজড শ্রেণীর মানুষের কনজাম্পশনই এরমধ্যে সিংহভাগ দখল করে আছে। তার মানে দরিদ্র প্রান্তিক পরিবারগুলোর পেটে কয়কেজি মাংস জোটে বছরে? কেজিতে নাকি গ্রামে হিসেব করবো?

এর বিপরীতে বছরে ৯৭.১ কেজি মাংস ভক্ষণ করে সর্বোচ্চ স্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। তালিকায় শীর্ষ দশটি দেশ হচ্ছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, ইজরায়েল, ব্রাজিল, চিলি, কানাডা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং নিউজিল্যান্ড। এসকল দেশের মাংস ভক্ষণের হার দেখলে অবাক হতে হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তির দিনে ৭০-৯০ গ্রামের অধিক মাংস খাওয়া অনুচিত, অর্থাৎ বছরে বড়জোর ২৫-৩০ কেজি। সেজায়গায় এসকল দেশের নাগরিকেরা এর দুই-তিনগুণেরও বেশি মাংস সাবাড় করে যাচ্ছেন প্রতিবছর।

এদিকে এই তালিকায় মুসলিমপ্রধান দেশগুলো ধারেকাছেও নেই, আর বাংলাদেশ একেবারে তলানিতে। যদিও কোরবানীর সময় আসলে পশুহত্যা নিয়ে পশ্চিম থেকে আসা নানান নসীহত এই দেশগুলোকেই শুনতে হয়। অথচ ট্র‍্যাডিশনালি মুসলমানেরা প্রায় সেমি-ভেজিটারিয়ান বলা যায়। নবীজী (সাঃ)-এর খাদ্যতালিকায় মাংসের পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। এমনকি নিয়মিত মাংস ভক্ষণকে প্রায়শই নিরুৎসাহিত করা হয়েছে ইসলামে। মুয়াত্তা’র একটি হাদীসে দেখা যায় হযরত ওমর (রাঃ) বলছেন- “মাংস হতে সাবধান, এর আসক্তি মদে আসক্তির মতোই”।

এই মুয়াত্তা কিতাবেই পুরো একটি চ্যাপ্টার আছে বাব-উল-লাহাম নামে। যার অর্থ ‘মাংসের অধ্যায়’। এই চ্যাপ্টারের এক হাদীসে দেখা যায় হযরত ওমর (রাঃ) উনার খেলাফতকালে পরপর দুইদিন মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেন। সর্বোচ্চ একদিন পর একদিন খাওয়ার অনুমতি দেন। তারপর তিনি দেখলেন যে এক লোক প্রতিদিনই মাংস ভক্ষণ করে যাচ্ছে। তিনি সেই লোককে জিজ্ঞেস করলেন-“তুমি বাজারে গেলে শুধু মাংসই কেনো? তাই না? মানে তোমার মনে মাংস খুঁজলেই তুমি বের হয়ে মাংস কিনে নিয়ে আসো?” লোকটি উত্তর দিলো-“জ্বি, আমিরুল মুমিনীন! আমি মাংস খেতে ভালোবাসি।” ওমর (রাঃ) তখন বললেন- “ভালো হয় নিজের পেটটা একটু ভেতরের দিকে চাপাও আর অন্যদেরও একটু খাওয়ার সুযোগ করে দাও।”

মজার ব্যাপার হইল খলিফা বলেন নাই যে আচ্ছা ঠিকাছে তোমার যখন গোশত ভালা লাগে, তবে তাই খাও। আমরা প্রোডাকশন বাড়ায়ে দেই। এইটা মাটির কাছাকাছি থাকা কোনো ব্যক্তিই আসলে বলবেন না। খলিফাও তাই বলেন নাই। মানুষের অতিরিক্ত ভোগের চাহিদা পূরণের জন্য প্রোডাকশন বাড়ায়ে দেয়া একটা ক্যাপিটালিস্ট ফেনোমেনা। অধিক মাংস ভক্ষণকারী দেশগুলোতে এই ভোগের চাহিদা চরমে। এই চাহিদার শিকার হয়ে ধ্বংস হচ্ছে সেখানকার পরিবেশ আর হুমকির মুখে পড়ছে বৈশ্বিক জলবায়ু। ক্যাটল র‍্যাঞ্চিং-এর জন্য দক্ষিণ আমেরিকায় আমাজনের রেইনফরেস্ট প্রতিদিন ২ লাখ একর করে ধ্বংস করা হচ্ছে মানুষের লোভের চাহিদা মেটাতে গিয়ে। সেইসাথে গরু-ছাগলপ্রতি কার্বন ফুটপ্রিন্টতো আছেই।

এইসব অনাচার লক্ষ্য করে গোশত না খাওয়ার আন্দোলনও তৈরি হয়েছে সেসব দেশে। তবে আমাদের দেশের আমজনতার কাছে এইসব আন্দোলনের তেমন কোনো আবেদন নাই। কারণ এখানে বহু পরিবার বছরে একবার কুরবানীর ঈদ ছাড়া গোশত চোখেও দেখেনা। এইখানে তাই বছরে একবার সবাই মিলে গোশত খাইতে পারাটাই একটা উৎসব। ধর্মীয় দিক বাদেও কুরবানীর সামাজিক গুরুত্ব এইখানে কতোটা সেইটা বুঝার জন্যে আপনাকে গ্রামে যাইতে হবে। ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার কুরবানীর দিন দাদীর সাথে গোশতের ঝাঁকা আর চালের পাতিল নিয়ে পুরো পাড়ায় যারা কুরবানী দেয়নি তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের ভাগটুকু বুঝিয়ে দিয়ে আসার কাজে অংশ নিয়েছিলাম। এই কাজ কোনোদিন নিজে না করলে এইটার হাকীকত বোঝা মুশকিল। কুরবানী শুধু খাওয়ার উৎসব না, নিজের ভাগের অতিরিক্ত অংশটা শেয়ার করে খাওয়ার উৎসব।

এই শেয়ার করে খেতে গিয়ে “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। বাসায় গরুর গোশতের দাওয়াত রইল সকলকে।”-এই কথা যারা বলে তারা গরুর পাছা দিয়া যেইটা বাইর হয় ওইটা মাথার ভিতর নিয়া ঘুরে। গরু দিয়া মুসলমানিত্ব জাহিরের এই চেষ্টা দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চলে আসা ধর্মীয় বৈপরীত্যের হ্যাংওভার ছাড়া কিছু না। ভারতে গরুকেন্দ্রিক Mob-lynching এর প্রতিবাদে আরো বেশি করে গরু কেবল গরুই কোরবানি দেয়া মুসলমানদের একটা পলিটিকাল এটেম্পট হইতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে সবাইকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গরুর গোশতের দাওয়াত দেয়াটা শিষ্টাচার-বহির্ভুত বলে আমি মনে করি। এমনকি আমার সামনে কোনো নির্ধার্মিক হিন্দু বন্ধু স্বেচ্ছায় গরুর গোশত খেলেও আমি মাঝেমধ্যে অস্বস্তিতে পড়ি। খুশি হওয়ারতো কিছু নাই এখানে। কারণ সে যদি সংখ্যালঘু হীনম্মন্যতার জায়গা থেকে গরু খেয়ে সংখ্যাগুরুর মূলধারায় আসতে চায় তবে সেটা সংখ্যাগুরুর সদস্য হিসেবে আমার জন্যে অপমানজনক। বরং সে কালচারাল জায়গায় তার স্বকীয়তা স্বমহিমায় বজায় রেখেও আমার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। বৈচিত্র‍্যের সৌন্দর্য এখানেই।

ভাষাগত-জাতিগত বৈচিত্র‍্য সত্ত্বেও কেবল মুসলমান পরিচয়ের কারণেই আবার যখন বিদেশের মাটিতে ভাই হিসাবে গণ্য হই তখন ভিন্ন রকমের অনুভূতি জাগা স্বাভাবিক। ২০১৬ সালের কুরবানীর ঈদে ছিলাম দক্ষিণ ভারতে। অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়েই কাটছিল ঈদের দিন। দেশের সবাই কতো আনন্দে ঈদ করছে, গোশত-রুটি খাচ্ছে ভাবতেই বুকে হাহাকার করে উঠছিল। হঠাৎ করে রুমের দরজায় নক শুনে দরজা খুলেই দেখি আমাদের হোটেলের মুসলমান মালিক কুরবানীর গোশত পাঠিয়েছেন। বিদেশ-বিভুঁইয়ে বসে এরকম উপহার পেয়ে আমি আর আম্মু সেই আনন্দের হাসিটাই দিয়েছিলাম যেটা আমি দাদীর সাথে গ্রামে গোশত বিতরণের সময় পাড়ার মানুষের মুখে দেখতে পেতাম।

এই হাসিটা আপনিও দেখতে পাবেন চাইলে। প্রক্রিয়াটি সহজ। সামর্থ্য অনুযায়ী কুরবানী দিন, অবশ্যই পশুগুলোকে সবচেয়ে কম কষ্ট দিয়ে। পশু জবাইয়ের পর ভাড়াটে কসাই যদি পশুর প্রাণ দ্রুত চলে যাবার জন্য ছুরি দিয়ে জবাইয়ের জায়গায় অর্থাৎ স্পাইনাল কর্ডে খোঁচাখুঁচি করে তবে তাদের এই কাজে নিরুৎসাহিত করুন। গোশত কাটাকুটি হয়ে গেলে সবচেয়ে কাছের বাড়িগুলোয় কারা কারা কুরবানী দিচ্ছেন না তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজ হাতে গোশত(সামর্থ্য থাকলে চাল-ডালও) পৌঁছে দিয়ে আসুন, ঘরে এসে খেয়ে যাওয়ার দাওয়াত দিন, তিনি রান্না করলে আপনিও খেয়ে আসবেন বলে রাখুন। মনে রাখুন, এটা দান না, নিজের ভাগের অতিরিক্তটাই শেয়ার করে খাওয়ার একটি ধর্মীয়-সামাজিক প্রক্রিয়া। অন্যের সাথে শেয়ার করার কাজটা যদি সহীহ নিয়তে আন্তরিকভাবে করতে পারেন, তাহলে সেই স্বর্গীয় হাসির দেখা পাবেন আপনিও।

এই ঈদটা ভোগের নয়, এই ঈদটা ত্যাগের।
সবাইকে ঈদ মোবারক!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *