ফের উঠে যাচ্ছে গোডাউন সেতুর ওয়েরিং কোর্স

উত্তর চট্টগ্রাম বৃহত্তর চট্টগ্রাম

Sharing is caring!

ইমরান হোসেন, রাঙ্গুনিয়া: চারদিকে নদীবেষ্টিত হওয়ায় সরফভাটা ইউনিয়ন থেকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সদরে যুক্ত হওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিলো নদীপথ। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণাংশে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরে সরফভাটা ইউনিয়ন। নদী পেরিয়ে উপজেলা সদরে যাতায়াত করা বেশ সময়সাপেক্ষ ছিলো। যোগাযোগ বিড়ম্বনার অবসান ও জনদূর্ভোগ লাঘবের লক্ষ্যে একটা সময় রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদীর উপর গোডাউন সেতু নির্মাণ ছিলো রাঙ্গুনিয়াবাসীর প্রাণের দাবি।

গোডাউন সেতু বাস্তবায়ন হওয়ার পর এ ইউনিয়নের সাথে সমগ্র দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ার যোগাযোগ বিপ্লব হয়েছিলো। কিন্তু সেতু নির্মাণে গুনগত মান নিশ্চিতকরণে অবহেলা ও ভারী যানবাহন চলাচল, ডেক স্ল্যাবের জয়েন্টের প্লেইট বার উঠে যাওয়া এসবের ফলে- বিগত ২০১৮ ইং আগষ্টের দিকে এ গোডাউন সেতুর একটি স্প্যানের ওয়েরিং কোর্স (মূল স্ল্যাবের উপরে ১.৫”-২” কনক্রিটের আস্তরণ) এ ফাটল ধরে বেশ কিছু অংশের সিসি কাস্টিং উঠে গিয়েছিলো।

এ নিয়ে গতবছরের ৭ আগষ্ট সোস্যাল মিডিয়া ফেইসবুকে পোস্ট করা হলে তা খুব দ্রুত শেয়ার হওয়ায় জনপ্রতিনিধি ও কর্তৃপক্ষের নজরে আসে, এবং বেশকিছু পত্রিকায় সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিলো।

এরপরে ফাটল ধরে উঠে যাওয়া অংশে বিটুমিনেস কনক্রিট এর আস্তরণ দেওয়া হয়। কিন্তু তা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, এখন আবারও আগের মতই সে অংশে ফাটল ধরে উঠে যাচ্ছে। যার ফলে এ অংশে যেকোনো সময় প্রাণঘাতী দূর্ঘটনা ঘটার আশংকা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, এ সেতুটির সংস্কারের নিমিত্তে ও দূর্ঘটনা এড়াতেই ওয়েরিং কোর্সের ফাটল ধরে ঢালাই উঠে যাওয়া অংশে বিটুমিনেস কনক্রিট দিয়ে ঢালাই করা হয়,
অথচ স্থায়ী সমাধানে দ্রুততম কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় এটি স্থায়ী হয়নি এবং তাৎক্ষণিকভাবে সংস্কারের মাত্র ৭ মাসের মধ্যে আবারও সেই একই স্থানে ফাটল ধরেছে। এ সেতুটির সংস্কারে স্থায়ী সমাধানে দ্রুততম কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বড় ধরনের দূর্ঘটনার পাশাপাশি একটা সময় পর এ সেতুটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে বিকল হওয়ার আশংকাও করছে স্থানীয়।

সরফভাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শেখ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ রাঙ্গুনিয়ার উন্নয়নে আপোষহীন। এর ধারাবাহিকতায় গোডাউন সেতুর ওয়েরিং কোর্স ফাটল ধরে উঠে যাওয়া অংশটির সংস্কার ও সেতুটির রঙের কাজসহ করে ঝলমল করে দেওয়া হবে খুব শিগগিরই।

তিনি আরও বলেন, গোডাউন সেতুটি বাস্তবায়নের ফলে আমাদের সরফভাটা তথা গোটা দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ার যোগাযোগ বিপ্লব হয়েছে।

সৈয়দ আলী সড়কের ক্ষেত্র বাজারস্থ আরসিসি সড়ক ও কানুর হাটের মাদ্রাসা মার্কেট থেকে শিলক ব্রিজ এর প্রবেশপথ পর্যন্ত এ কাজের সাথে গোডাউন সেতুটির সংস্কারের কাজও সংযোজন করা হয়েছে। ক্ষেত্র বাজারস্থ আরসিসি সড়কের কাজ প্রায় শেষ ইতিমধ্যেই।

জনদূর্ভোগ অবসানের লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে গোডাউন সেতুটি সংস্কারের কাজটির বাস্তবায়ন না হলে এলাকাবাসী তথা এ সেতুটির উপর দিয়ে যাতায়াত করা গোটা দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়াবাসীর জনদূর্ভোগ ক্রমেই বেড়ে যাবে।কাজেই খুব দ্রুততার সাথে এসব কাজের বাস্তবায়ন করে জনদূর্ভোগের লাঘবের জোর দাবী জানাই।

উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ দিদারুল আলম জানান, ‘গোডাউন সেতুটি মূলত নির্মাণের সময় সড়ক ও জনপদ বিভাগের অধীনে থাকলেও পরে এটি এলজিআরডি এর অধীনে আসে। গতবছরের আগষ্টে এ বিষয়টি নজরে আসলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। কিন্তু যাতায়াতের বিষয়টি মাথায় রেখে কিউরিং করা সময়সাপেক্ষ বলে সিসি কাস্টিং করে ওয়েরিং কোর্স করা সম্ভব হচ্ছেনা।

তিনি আরও বলেন, এ সেতুটির সংস্কারে স্থায়ী সমাধানের জন্য তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ এর একান্ত প্রচেষ্টায় ঢাকা থেকে আমাদের বিশেষজ্ঞ টিম এসে পরিদর্শন করে গেছেন এবং বিটুমিনেস ওয়েরিং কোর্স করার জন্য পরামর্শের ভিত্তিতে আমরা এস্টিমেট প্রণয়ন করেছি। সরফভাটা ক্ষেত্র বাজারস্থ আরসিসি সড়ক, কানুরহাট সংলগ্ন কাজের সাথে এ সেতুটির সংস্কার কাজও সংযোজন করা হয়েছে।ইতিমধ্যেই সরফভাটা ক্ষেত্র বাজারস্থ আরসিসি সড়কের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে,
এবং আশা করছি খুব দ্রুততম সময়ে অবশিষ্ট কাজসমূহও শেষ হবে। এছাড়াও ডেক স্ল্যাবের জয়েন্টের প্লেইট বারও পুনরায় স্থাপন করে, সেতুটির রঙ এর কাজও করা হবে।

প্রকৌশলীর ভাষায়ঃ ওয়েরিং কোর্স হচ্ছে- ডেক স্ল্যাবের উপরের স্তর যা মূল কাঠামোকে প্রটেকশন দেওয়ার জন্য উপরে দুই ইঞ্চি পুরু একটি স্তর দেওয়া হয়।

তবে এই সমস্ত ফাটল সাধারণত ময়েশ্চারিং ঠিকমত না হওয়ার কারণে, সঠিক অনুপাতে কনক্রিট মিশ্রণ না করায়, পানি ও সিমেন্ট মিশ্রণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে, পাথর ভাল না দেওয়া, মাটিযুক্ত ও অপরিষ্কার বালি দেওয়া, লবণাক্ত পানি, কনক্রিটে যদি ব্লিডিং- সেগ্রেগেশন হয়ে কনক্রিটের সিমেন্ট-বালি ও খোয়া আলাদা হয়ে গেলে, এমনকি ঠিকমত কিউরিং না করার কারণেও ফাটল ধরতে পারে।

উল্লেখ্যঃ ১৯৯৫ সালের ৩ মার্চ সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহম্মদ এই সেতুর নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন। সরকারের রাজস্ব খাতের প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭ দশমিক ৬ মিটার প্রস্থের এই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়- ১৯৯৫ সালের এপ্রিল মাসে।
কনকর্ড কনস্ট্রাকশন লি. এই সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে। তিন বছরের মধ্যে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় দশ বছরে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। প্রথমে সেতুটি পিলারের উপর লোহার প্লেইট দিয়ে নির্মাণ করার পরিকল্পনা ছিল।

১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আ.লীগ নেতা মরহুম সাদেক চৌধুরী প্লেইটের পরিবর্তে আরসিসি সেতু নির্মাণের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদবির করেন।
পরে নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে প্লেইটের পরিবর্তে আরসিসি সেতু নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় সেতু নির্মাণে ব্যয় প্রায় সাড়ে ১৯ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।
সেতুটি মূলত- একটি পিলার সেতু, ৮টি পিলার স্প্যান দিয়ে এই সেতু নির্মাণ করা হয়। সেতুটি নির্মাণে শেষ অংশের কাজ করেন বেক্সিমকো কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *