মারা গেলেন জিম্বাবুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে

আন্তর্জাতিক

Sharing is caring!

জিম্বাবুয়ের রাজনীতিতে সবচেয়ে বর্ণিল ব্যক্তিত্ব তিনি। স্বাধীন জিম্বাবুয়ের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশ শাসন করেছেন দীর্ঘদিন। উপনিবেশ জিম্বাবুয়েকে স্বাধীনতা এনে দেওয়ার পেছনে যে কয়েকজনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়, তাদেরও একজন তিনি। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে বছর দুয়েকও অবসর কাটাতে পারলেন না। ৯৫ বছর বয়সে জীবনাবসান ঘটলো রবার্ট মুগাবে’র।

জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম এই সৈনিক ছিলেন পশ্চিমাবিশ্বের কঠোর সমালোচক। বিশেষ করে যে যুক্তরাজ্যের অধীনে উপনিবেশ হয়ে থাকতে হয়েছিল জিম্বাবুয়েকে, সেই যুক্তরাজ্যকে কখনো ছেড়ে কথা বলতেন না তিনি। আজীবন তিনি দেশটিকে ‘শত্রু দেশ’ হিসেবেই অভিহিত করে গেছেন।

স্বাধীন জিম্বাবুয়েকে মুগাবে কতটা সঠিক পথে এগিয়ে নিতে পেরেছেন, তা নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি খড়গহস্ত ছিলেন মুগাবে, আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ছিল। দূর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণেই একসময়ের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ জিম্বাবুয়েকে বরণ করতে অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব। তা সত্ত্বেও গোটা বিশ্বের মনোযোগ সবসময় ধরে রেখেছেন রবার্ট মুগাবে।

১৯২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রোডেশিয়াতে জন্ম নেন রবার্ট মুগাবে। তখন রোডেশিয়া (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) ছিল আফ্রিকায় ব্রিটিশদের কলোনি। স্বাভাবিকভাবেই সেই উপনিবেশ ছিল শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা শাসিত। কাঠমিস্ত্রির ঘরে জন্ম নেওয়া মুগাবে ছিলেন মেধাবী। স্থানীয় রোমান ক্যাথলিক মিশন স্কুলে পড়ালেখা শেষ করে সেখানেই শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার হারানে ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তি নিয়ে পড়ালেখা করতে যান। পরে শিক্ষকতা শুরু করেন ঘানাতে। সেখানেই স্বাধীন ঘানার নেতা কোয়ামি এনক্রুমাহ’র সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে রাজনৈতিক ভাবনায় প্রভাবিত হন তিনি।

১৯৬০ সালে রোডেশিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন মুগাবে। ওই সময় তিনি আফ্রিকান জাতীয়তাবাদী নেতা জশুয়া এনকোমোর সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। পরে তিনি জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন (জানু) দল গঠিত হলে প্রতিষ্ঠা সদস্য ছিলেন তিনি।

১৯৬৪ সালে রোডেশিয়া সরকারের সমালোচনা করায় মুগাবে আটক হন। বিনা বিচারে তিনি প্রায় এক দশক কারাবন্দি থাকেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় তার সন্তান মারা গেলেও তার শেষকৃত্যে উপস্থিত হতে দেওয়া হয়নি মুগাবেকে। পরে কারাগারে থাকাকালেই ১৯৭৩ সালে জানু দলের সভাপতি নির্বাচিত হন।

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মুগাবে চলে যান মোজাম্বিকে। সেখান থেকেই রোডেশিয়ায় গেরিলা আক্রমণ চালাতে শুরু করেন। এসময় এনকোমো’র জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান পিপল’স ইউনিয়ন (জাপু) দলের সঙ্গে সমঝোতা হয় জানু দলের।

রোডেশিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা শুরু হলে মুগাবে অন্যতম নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ওই সময়ের রোডেশিয়ার নেতাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে সহিংস, একসঙ্গে দাবি নিয়ে আপসহীন। ১৯৭৬ সালে লন্ডন সফরে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, কেবল বন্দুকের মাধ্যমেই রোডেশিয়ার সমাধান আসতে পারে।

নিজেদের অনমনীয় চরিত্রের কারণেই মুগাবে ওই সময়ে রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। স্বাধীনতা নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আলোচনাতেও তিনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সফল ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। তার নেতৃত্বেই ১৯৭৯ সালে ল্যাংকাসটার হাউজ চুক্তির ফলে রোডেশিয়া পরিণত হয় জিম্বাবুয়ে প্রজাতন্ত্রে, প্রণয়ন করা হয় সংবিধান। ১৯৮০ সালে প্রথম নির্বাচন পায় স্বাধীন জিম্বাবুয়ে।

প্রথম নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয় পায় মুগাবের দল জানু পার্টি। ওই সময় বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছে তার এমন বিশাল জয় ছিল অপ্রত্যাশিত। অন্য দলগুলো অবশ্য ওই সময় ভোটে কারচুপি ও ব্যাপক জালভোটের অভিযোগ আনে। স্বঘোষিত মার্কসিস্ট মুগাবে ক্ষমতায় এলে শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবেন— এমন আশঙ্কা ছিল অনেকেরই। তবে মুগাবে সেসময় যথেষ্ট নমনীয় মনোভাব দেখান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি। তবে অর্থনৈতিক নীতিমালা নিয়ে ওই সময় মুগাবের সঙ্গে সরকারে থাকা এনকোমো’র দূরত্ব বাড়ে। মুগাবেও ধীরে ধীরে একদলীয় শাসনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। প্রতিপক্ষের রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে থাকেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সদ্য স্বাধীন হওয়া জিম্বাবুয়েতে ওই সময় রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয় হাজারও মানুষ।

রাজনৈতিকভাবে দমন-পীড়নের শিকার হয়ে এনকোমো বাধ্য হয় তার জাপু দলকে মুগাবের জানু দলের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে। ১৯৮৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিলুপ্ত ঘোষণা করে মুগাবে হয়ে যান জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো জিতে ক্ষমতা ধরে রাখেন তিনি।

২০০০ সালের শুরুর দিকেই প্রথমবারের মতো বড় ধরনের রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় মুগাবেকে। ট্রেড ইউনিয়নের সাবেক নেতা মরগান সাংগিরাইয়ের নেতৃত্বে মুভমেন্ট ফর ডেমোক্রেটিক চেঞ্জ (এমডিসি) তখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। ওই সময় শ্বেতাঙ্গদের জমির মালিকানাস্বত্বের জের ধরে এমডিসি সমর্থিত কৃষকদের ওপর চড়াও হয় মুগাবে সরকার। বেশ কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গ কৃষদের প্রাণের বিনিময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় সরকার।

জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাকে মুগাবে’র সবচেয়ে বড় ব্যর্থ মনে করা হয়। একসময় খাদ্য উৎপাদনে আফ্রিকা অঞ্চলের শীর্ষ দেশ ছিল জিম্বাবুয়ে। স্বাধীনতা লাভের দুই দশক পরে সেই দেশটিকেই খাদ্য আমদানি করে পেট ভরাতে হয়েছে জনগণের। অর্থনৈতিক এই দুরাবস্থার সুযোগেই মুগাবের বিরোধিতা করে ২০০০ সালের নির্বাচনে ১২০টি আসনের মধ্যে ৫৭টি আসনে জয় পায় এমডিসি। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সক্ষম হওয়ায় সরকারে টিকে যায় মুগাবের দল জানু-পিএফ। দুই বছর পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুগাবে পেয়েছিলেন ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। প্রায় ৪২ শতাংশ ভোট পাওয়া সাংগিরাই তার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন ততদিনে। যদিও অভিযোগ ছিল, ওই নির্বাচনে গ্রাম অঞ্চলে সাংগিরাই সমর্থক অধ্যুষিত অনেক ভোটকেন্দ্রই বন্ধ রাখা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও ওই নির্বাচনে মুগাবের জয়কে স্বীকৃতি দেয়নি। তাতে করে কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকেন মুগাবে। কমনওয়েলথও জিম্বাবুয়ের সদস্যপদ স্থগিত করে।

২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো পরাজয়ের স্বাদ নিতে হয় মুগাবেকে। ওই বছরের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে প্রথম রাউন্ডে হেরে যান তিনি। যদিও রান-অফ নির্বাচনে সাংগিরাই সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলে পার পেয়ে যান মুগাবে। সাংগিরাই-ও ওই সময় বলেন, মুগাবের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ওই সময় জিম্বাবুয়ের অর্থনৈতিক অবস্থাও আরও খারাপ হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মুগাবে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে আলোচনায় সম্মত হন। ২০০৯ সালে সাংগিরাইকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বীকার করে নেন। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলে আসছে, ওই সময়ও মুগাবে প্রতিপক্ষের রাজনীতিবিদদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালিয়েছেন।

২০১৩ সালের নির্বাচনে ফের ৬১ শতাংশ ভোট পেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে জয়ী হন রবার্ট মুগাবে। সাংগিরাইকেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেন। ওই নির্বাচন নিয়েও ব্যাপক প্রশ্ন ছিল। তবে জিম্বাবুয়ের আগের নির্বাচনগুলোর মতো দৃশ্যত তেমন সহিংসতা ছিল না। ফলে মুগাবেকে মেনে নিতে বাধ্য হয় সবাই। ক্ষমতাও সুসংহত হয় তার। এসময় অবশ্য শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করেন মুগাবে। তার অবর্তমানে কাকে ক্ষমতায় বসাবেন, তা নিয়েও শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। স্ত্রী গ্রেসকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন, এমন একটি গুঞ্জনও ছিল। তবে মুগাবে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি অংশ নেবেন।

শেষ পর্যন্ত আর ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়া হয়নি মুগাবের। ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর দেশটির সেনাবাহিনী তাকে নজরবন্দি করে। চার দিন পর মুগাবের দল জানু-পিএফ-এরই ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন মাংগাগওয়াকে দলের নেতা ঘোষণা করা হয়। তবে মুগাবে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হননি। পরে ২১ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে জিম্বাবুয়ে সংসদে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পরে ওই দিনই সংসদের স্পিকার ঘোষণা করেন, মুগাবে পদত্যাগ করেছেন প্রেসিডেন্ট পদ থেকে। এর মাধ্যমে অবসান হয় মুগাবের দীর্ঘ ৩৭ বছরের শাসনামলের।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটানোর পর ক্ষমতায় এসে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার যে সুযোগ তৈরি করেছিলেন, তার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়িয়েছেন মুগাবে। আফ্রিকার নায়ক ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, সেই মুগাবেই কালক্রমে পরিণত হন স্বৈরশাসকে। নাগরিক অধিকার খর্ব করে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে সেই মুগাবেই দাঁড়িয়ে যান গণতান্ত্রিক, স্বাধীন চেতনার বিপক্ষে। দুর্নীতি আর আর্থিক অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই মুগাবেই জিম্বাবুয়েকে পরিণত করেন তলাবিহীন ঝুড়িতে। তাই তার ৩৭ বছরের শাসনামলের দায় হয়তো জিম্বাবুয়েকে বয়ে বেড়াতে হবে আরও কয়েক দশক। কিন্তু তাই বলে কি ঔপনিবেশিক শক্তিকে পরাভূত করে জিম্বাবুয়েকে স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিতে মুগাবের অবদানটুকু কি ভুলে যাবে জিম্বাবুইয়ানরা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *