দামতুয়া ট্র‍্যাকিং, আমাদের গাইড ডনরই ও তার না জানা কষ্টের কথা

পর্যটন ফিচার

Sharing is caring!

আবু রায়হান তানিনঃ- ডিমপাহাড় থেকে ফিরে আমরা ১৭ কিলোমিটার আদু পাড়ায় আসি সকাল ১১ টার কিছু আগে। সেখান থেকে আমরা দামতুয়া ঝর্ণার উদ্দেশ্যে ট্র‍্যাকিং করবো। সেজন্য আদুপাড়া থেকে বাধ্যতামূলক একজন গাইড নিতে হয়। আমার ধারণা ছিল গাইড হয়তো বাঙ্গালী কেউ হবে। ওমা গাইড হিসেবে যাকে আমাদের সাথে দেয়া হলো সে পাহাড়ি, নাম ডানরই। পাহাড়িদের ব্যাপারে আমার মাথায় গেঁথে গেছে তারা কথা বলেনা। যে কথাই বলেনা তার নেতৃত্বে ৬ ঘন্টার ট্র‍্যাকিংয়ে কি মজা হবে তা ভেবে হতাশ হলাম।

ডনরইয়ের নেতৃত্বে হেটে চলছি

১১ টার দিকে ডানরইয়ের নেতৃত্বে আমরা রওনা দিলাম দামতুয়ার উদ্দেশ্যে। সবার মত ডানরইয়ের হাতেও বিশাল দা। ডানরই সামনে সবাই তার পিছনে। আমি তার পাশে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলাম। নাম ধাম জেনে তাকে প্রথম প্রশ্ন করলাম তোমরা এত বড় দা নিয়ে ঘুর কেন? সে উত্তর দিল পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরি, সামনে সাপ জন্তু পড়লে এটা দিয়ে কেটে ফেলি। পাহাড়ে সবার দা নিয়ে ঘুরার ব্যাপারে জাগা প্রশ্নের সমাধান হলো। মোটামুটি ৫/৭ মিনিটে ডানরইয়ের সাথে আমার একটা ভাব হয়ে গেল। সে জানালো তার মা মারা গেছে। নতুন মা ভাল না। মাকে নিয়ে তার বাবা পাড়ার বাইরে থানচি সড়কের পাশে নতুন সংসার করেছে। দাদীর কাছে সে মানুষ। দাদীর কষ্ট কমাতে সে বিয়ে করেছে। তার দুই ছেলে মেয়ে। তার বয়স ১৯। এসব শুনে ডানরইয়ের জন্য একটা মায়া জন্মালো, নিজের জন্যও সামান্য হলো।

সামনের পাড়াটা ডনরইয়ের পাড়া। এরকম বেশ কিছু পাড়া পার হতে হয়।

পথে ডানরইয়ের ঘর পড়লো। সে তার ঘর দেখালো। তার নেতৃত্বে আমরা জুম ক্ষেত আর পাহাড় ধরে এগুতে লাগলাম। কদ্দুর যেতে সে আমাদের বাঁশ কেটে লাঠি বানিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিল। কিন্তু সৌরভের আপত্তির মুখে আমরা ৭ জনে মাত্র ২ টা লাঠি নিলাম। সে আমাদের সবার উদ্দেশ্য হালকা কিছু বক্তৃতা করলো। যে হাটার পথে কিভাবে হাটতে হবে। দল থেকে হারিয়ে গেলে কি করতে হবে। দল থেকে হারিয়ে গেলে নাক বরাবর হাটার পরামর্শ দিল সে। কোথাও দুইটা রাস্তা পেলে সে দাগ টেনে নির্দেশনা দিয়ে দিবে বলেও জানালো।

ঝিরিপথ আর পাহাড় ধরে হাটছি আর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ডানরইয়ের সাথে কথা বলছি। ততক্ষণে বুঝে গেছি কথা বললে সেও কথা বলবে। সে যে শুধু কথা বলেছে তা না, সে তার কষ্টের ঝাঁপিও খুলে বসেছে। পাহাড়ি জীবনের কষ্টের কথা বারবার বলছিল। বেশ কয়েকবার বলেছে পাহাড়ে অনেক কষ্ট। এই কথাটা বলার সময় তার চোখে মুখে যে মায়া দেখেছি আমি সম্ভবত তা অনেকদিন ভুলতে পারবো না। পাহাড় ডিঙ্গানোর এক ফাকে সে বলেছিল বেশি উচ্চস্বরে কথা না বলতে। কিন্তু আমাদের সাথে থাকা নুরু মামা গলা ছেড়ে গাইতে লাগলো। আমি সৌরভকে বললাম নুরুকে থামাইতে। ডানরই আমাকে বললো, থামাবে কেন? আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম সমস্যা হবে না? সে বললো সমস্যা কেন হবে, অনেক ভাল। কোন কষ্ট থাকেনা, দূর হয়ে যায়। আমার তাকে জিজ্ঞেস করার কথা ছিল তার কিসের এত কষ্ট, পরে জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠেনি।

পাহাড়, ঝিরিপথ আর জুম ক্ষেত ধরে ঘন্টাখানেক এগুনোর পর আমরা একটা বেঞ্চের সন্ধান পেলাম। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিশাল বপুর মালিক বিশ্বজিত দৌড়ে গিয়ে সেই বেঞ্চে বসার চেষ্টা করতেই সেটা ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হলো। ডানরই জানালো এটা বসার জন্য না, ফল-মূল সাজিয়ে রাখার জন্য। পাশেই ফলের বাগান। সে পাহাড়ি ভাষায় ডাক দিতেই পঞ্চাশোর্ধ এক মহিলা এলো। তার সাথে কথা বলে সে আমাদের জানালো এই মহিলার পেয়ারা, লটকন পেপে সহ বেশ কিছু পাহাড়ি ফল আছে। আমি আগে থেকেই লবন মরিচ মিক্স করে পকেটে রেখেছিলাম। মহিলার সাথে গিয়ে আমরা তার গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে খেলাম। কিছু লটকন নিলাম। একটা গাছ পাকা পেপে ঐ মহিলা আমাদের উপহার দিল। সব মিলিয়ে মহিলাকে ৫০ টাকা দেয়া হলো। ডানরই আমাদের জানালো যে মহিলা খুব খুশি হয়েছে। তার থেকে বিদায় নিয়ে আমরা সামনে আগালাম। পথে আরো পাহাড়িদের সাথে দেখা হলো। সবার সাথে ডানরই পাহাড়ি ভাষায় কথা বললো। আমরা তার মাধ্যমে দুয়েকজনের সাথে কথা বললাম। বুঝলাম পাহাড়িরা কথা বলেনা এই ধারণা আমার ভুল ছিল। তাদের সাথে কথা বললে তারাও কথা বলে। হেসে কথা বললে তারা খুশিও হয়।

ফল রাখার বেঞ্চি।

দামতুয়া যাওয়ার এই পথে ৫/৬ টা পাহাড়ে উঠতে হয় আবার নামতে হয়। এই উঠানামার পথগুলো খাড়া আর পিচ্ছিল বেশ। প্রতিটা পাহাড় থেকে আলাদা আলাদা ভিউ পাওয়া যায়। দুইটা পাহাড়ের মাঝে পাহাড়ি ঝিরি আর পাথরের স্তুপ আছে। পথে বেশ কিছু পাড়া পাওয়া যায়। প্রতিটা পাড়ায় ১০/৩০ টা ঘর। বেশ সুন্দর আর গোছালো পাড়াগুলো। এভাবে মোট ৩ ঘন্টা হাটার পর আমরা ব্যাঙ ঝিরি পৌঁছালাম। জানলাম কয় কদম হাটলেই আমাদের গন্তব্য, দামতুয়া ঝর্ণা। আমাদের তখন আর পা চলে না, ক্লান্তি আর অবসাদে ছেয়ে গেছে সবটা কিন্তু সৌরভ ব্যাঙঝিরিতে নামলো। আমার বেশ বিরক্ত লাগলো। আমি তারে বললাম বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু। কিছুক্ষণ বাদে তানিমও তার সাথে যোগ দিল। আমি থামলাম না। হেটে চলে গেলাম দামতুয়াতে।

এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ের মাঝে বয়ে চলা ঝিরি পথ। চাইলে এখানে পাথরে বসে আপনি পাও ভিজিয়ে নিতে পারবেন।

গিয়েতো আমি অবাক, ওমা এতো খৈয়াছড়া ঝর্ণার মতই। এটা দেখতে এত কষ্ট কেন? এখানে আলাদা হচ্ছে দুই পাশে মোট তিনটা ঝর্ণা। আমার কাছে মনে হলো ঝর্নার চেয়ে হেটে আসা পথটাই আমার ভাল লাগার কারণ। পরে তানিম বললো দুনিয়ার সব ঝর্ণাই প্রায় একম এই যে আসার পথে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা এটার জন্যই মানুষ দিনের পর দিন নতুন নতুন ঝর্ণায় যায়। মেনে নিলাম। ৩ ঘন্টা পাহাড় বেয়ে ঝর্ণায় গিয়ে নিজের মধ্যে একটা ভাব এলো। কিন্তু বেশিক্ষণ এই ভাব রাখতে পারলাম না। কিছুক্ষণের মধ্যে দুটো মেয়ে নিয়ে একটা টিম ঝর্ণায় এলো। তাদের একজন আবার বোরকা পড়া।

আমি ঝর্ণায় গা ভেজালাম না। কেন জানি ইচ্ছে হলো না। সেখানে আধা ঘন্টা সময় কাটিয়ে ঠিক ২ টা ৩৫ মিনিটে আমরা ফিরতি যাত্রা আরম্ভ করলাম। এর মধ্যে এক পশলা বৃষ্টিও হয়ে গেছে। ফেরার যাত্রাটা আরো কঠিন হয়ে গেল। ফেরার পথে আবার আমরা ঐ বাগানে থামলাম। সেখান থেকে আখ নিলাম। আখের দাম মিটাতে গিয়ে জানলাম সে বাংলা ভাষা জানে না, টাকাও চিনে না। ডানরইকে জিজ্ঞেস করলাম তাদের টাকা লাগে না? সে বললো বেশিরভাগের লাগেনা। এদের সব কিছু পাহাড়ই যোগায়। জানতে চাইলাম বিনিময় প্রথা আছে কিনা? সে জানালো আছে। আবারো সে বললো পাহাড়ে অনেক কষ্ট।

ব্যাঙঝিরি, দামতুয়া ঝর্ণার আগেই এমন ঝর্ণা পরে।

ফেরার পথে আমি ডানরইয়ের আগে আগে হেটে চলে আসলাম। আসার পথে একটা ঝিরিতে পাথরের উপর বসে আমরা সাথে নিয়ে যাওয়া নাস্তা খাওয়া শুরু করলাম। এর মধ্যে এক পাহাড়ি মহিলা ৩ টা বাচ্চা নিয়ে যাচ্ছিল। সে আমাদের কাছ থেলে একটা বিস্কিট চেয়ে নিল ছোট বাচ্চাটিকে দেয়ার জন্য। আমরা বললাম আরো নিতে। ঐ দুটো বাচ্চাকেও দিতে। সে খুব খুশি হলো। যাদের দিল তারাও খুব খুশি হলো। অল্পতে তুষ্ট মানুষ আজকাল দেখিনা খুব একটা। এই দেখাটাও একটা আত্ম প্রশস্তি দিল। তবে তারা চলে যেতেই ডানরই বললো এই ঝিরির পানি খাওয়া যাবে না। কারণ এই ঝিরি দিয়ে মহিলা পার হয়েছে মাত্র। আমরা তার কথা রাখলাম। যদিও সৌরভ এটাকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিল। তবুও রাখলাম। আমরা পানি নিলাম সামনের ঝিরি থেকে।

পামিয়া পাড়া, সবচেয়ে সুন্দর আর গুছালো মনে হয়েছে এটাকে।

কিছুদুর সামনে যেতেই ডানরই একটা পাড়া দেখিয়ে আমাকে জানালো ঐ পাড়ার একজন গতরাতে আত্মহত্যা করেছে। কেন করেছে জিজ্ঞেস করতে সে এড়িয়ে গেল। এতক্ষণে তার কষ্টের কারণ কিছুটা আঁচ করতে পারলাম। ঐ মৃত্যু তাকে ছুঁয়ে গেছে হয়তো। নাও হতে পারে। বিকাল ঠিক ৫ টা ২০ মিনিটে আমরা আদুপাড়া মূল সড়কে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ পর বাইকে করে ফিরতি যাত্রা আরম্ভ করলাম আলী কদমের উদ্দেশ্যে। ডানরই হাত নেড়ে বিদায় দিচ্ছিল। পুরো ৬ ঘন্টার ক্লান্তি, পাহাড় প্রকৃতির অনাবিল সহচার্য পেছনে ফেলে এগুচ্ছিলাম। থানচি সড়কের উঁচু নিচু রাস্তা তখন আর আমাকে টানছিল না। আমার মনে তখন ঘুরছে ‘আহা! ডানরইয়ের কিসের এত কষ্ট জানা হলো না!’

Leave a Reply