আজকে আমার কপালে পানি নাই মনে হয়,শহীদ তবারকের শেষ কথা

প্রচ্ছদ মতামত মুক্তচিন্তা

Sharing is caring!

৭৯-৮০’র দশকে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ একটি আসন ছাড়া সব আসনে জয় লাভ করে।শুধু মাত্র সংস্কৃতি সম্পাদক পদটি পায় শিবিরের তফাজ্জল,কলেজে ইনডোর প্রতিযোগিতা চলছিলো, নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু(ছাত্র মিলনায়তন সম্পাদক)।সেখানে টিংকুর সাথে তফাজ্জলের ঝগড়া হয়।কে বা কারা তফাজ্জল কে ছুরিকাঘাত করে এ ঘটনার জের ধরে শিবির তাদের সমগ্র চট্টগ্রাম বিভাগের কর্মীদের এনে কলেজ ছাত্রসংসদ দখলে নেয়,এবং কলেজ থেকে আমাদের কর্মীদের বের করে দেয়।তখন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন আ.জ.ম নাসিরউদ্দিন ভাই ও সম্পাদক ছিলেন সাহাবুদ্দিন (বর্তমান কানাডা প্রবাসী) ছাত্র সংসদের ভি.পি ছিলেন জাফর ভাই ও সম্পাদক ছিলেন আদর (আমেরিকা প্রবাসী) নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন শফর আলী ভাই ও সম্পাদক ছিলেন ইসহাক ভাই।দুই কলেজ ছাত্রলীগ তখন দেখবাল করতেন
মরহুম আলহাজ্ব এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজের ছাত্র নেতৃবৃন্দ কে মহিউদ্দিন ভাই গ্রান্ড হোটেলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।মহানগর ছাত্রলীগ,চট্টগ্রাম ও মহসিন কলেজ ছাত্রলীগ নিয়ে রাতে আমাদের সাথে মহিউদ্দিন ভাইয়ের বৈঠক হয়।এবং তিনি নির্দেশনা প্রদান করেন,সে অনুযায়ী সকাল থেকে দুই কলেজের আশেপাশে বিভিন্ন কলেজ ও মহানগর ছাত্রলীগ অবস্থান নেয়।

মহসিন কলেজ ছাত্রলীগ ও সিটি কলেজ ছাত্রলীগ অবস্থান নেয় মহসিন কলেজ ক্যান্টিনে,তখন মহসিন কলেজের জামাত পন্থী শিক্ষকরা কলেজের প্রধান ফটকে তালা মেরে দেয় সকালে।অবরুদ্ধ হয়ে উঠে ছাত্রসংসদ নেতা বাবর,ইউসুফ,জামসেদ ও ছাত্রনেতা মরহুম গোলাম মোস্তফা,হাসান মাহমুদ(বর্তমান তথ্য মন্ত্রী)সহ অনেকে।ক্যান্টিন ছিলো মূল গেইটের বাইরে পাহাড়ের উপর সেখানে তবারকসহ আমাদের অবস্থান।যে কথাটি আজকের দিনে আমাকে সবচেয়ে পীড়া দেয় সেটি হচ্ছে – আমি সবাইকে নাস্তা করাচ্ছি, তখন নতুন নতুন বাটার বন বেরিয়েছিলো সবাই বাটারবন পেয়েছিলো।কিন্তু তবারক ও আমার ভাগ্যে বাটারবন ছিলো না।

চকবাজারের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বাদল তার থেকে অর্ধেক বাটারবন তবারক কে খেতে দিয়েছিল।তখন ক্যান্টিনের সব খাওয়া শেষ। তবারক বললো আমাকে পানি দাও,কিন্তু সেদিন ক্যান্টিনে সব খাওয়ার পানি শেষ।তখন তবারক বললেন আজকে কি আমার কপালে পানি ও নাই?এ কথা শুনতে শুনতে আমরা চট্টগ্রাম কলেজের দিকে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে প্রকম্পিত করে চট্টগ্রাম কলেজের দিকে রওনা হলাম।গেইটে ডুকতে প্রথমেই পেলাম কুখ্যাত গিয়াসউদ্দিন কাদেরের একটি লাল গাড়ি।যে গাড়ি থেকে শিবিরের ছেলেদের অস্ত্র সরবরাহ হচ্ছে, শুরু হয়ে গেলো যুদ্ধ।শহীদ তবারক আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মরক্ষা করতে গিয়ে শিবিরের অফিসের সামনে পরে গেলো।সেখানে তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে।এক দিকে সমগ্র চট্টগ্রামের জামাত-শিবির ও পুলিশ আর অন্যদিকে ছাত্রলীগ, আমরা কলেজ ও ছাত্রসংসদ দখলে নিই।

কিন্তু সব চেয়ে দু:খজনক হলো সেদিন আমরা লিডারের নির্দেশনা মোতাবেক পরিকল্পিত ভাবে এগোতে পারিনি।

কাকতালীয় হলে ও সেদিন শহীদ তবারকের কথা সত্য হয়েছিল।মৃত্যুর সময় যখন তবারক পানি পানি বলে চিৎকার করছিলো তখন শিবিরের জাহাঙ্গীর,কাসেম,সাইদ
শহীদ তবারকের মুখে প্রস্রাব করে দিয়েছিলো।সে ভয়াবহ দিনের শহীদ তবারকের সেই কথাটি আমি যত দিন বেঁচে থাকবো আজীবন স্মরণ থাকবে।

আমি আমার সহযোদ্ধা শহীদ তবারকের বিদেহী আত্মার শান্ত কামনা করি।পাশাপাশি সে দিনের লড়াকু সৈনিক বাদল,হুমায়ুন কবির,এনাম,দিলদার,জাহাঙ্গীর,সাজিদ সহ অসংখ্য ভাইদের ও স্মরণ করি।

সেদিন দেওয়ান বাজার,চকবাজার ও কলেজে প্রচার হয়েছিল আমি নিহত হয়েছি।আমার পরিবারের সদস্যরা ও কান্না করতে করতে মেডিকেলে ছুটে গিয়ে ছিলেন।তার পরের দিন আমার আব্বা কে কলেজে ডেকে নিয়ে আমাকে টি.সি ধরিয়ে দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ।

আজকের দিনে আমাদের প্রত্যাশা ছিলো,আমাদের সরকার ক্ষমতায়, মহানগর ছাত্রলীগে উদ্যোগে একটি বড় ধরনের শোক সভা হবে।শুনেছি চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের দখলে,সেখানে শোক সভা হবে।

আশির দশকের নেতারা যাবেন,অন্তত পক্ষে চট্রগ্রাম কলেজে একটি শোকসভা করলে শহীদ তবারকের আত্মাটা শান্তি পেতো,আমাদের কথা বাদ’ই দিলাম ।

হায়’রে — নতুন প্রজন্মের ছাত্রলীগ ??

লেখক সাইফুদ্দীন আহমদ রবি
সাবেক সাধারণ সম্পাদক মহসিন কলেজ ছাত্রলীগ। (১৯৮০ দশক)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *