প্রশাসনের অভিযানের প্রেক্ষিতে পেঁয়াজের দাম অর্ধেকে নেমে এলো

অন্যান্য সংবাদ চট্টগ্রাম মহানগর

Sharing is caring!

সাম্প্রতিক সময়ে রাতারাতি দ্বিগুনে উন্নীত হওয়া পেঁয়াজের দাম জেলা প্রশাসনের অভিযানের প্রেক্ষিতে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ভারতের রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্তের জের ধরে রাতের মধ্যেই পেঁয়াজের দাম নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ৬৫-৭০ টাকা থেকে ১২০ টাকায়।

মঙ্গলবার সকালে অভিযান শুরুর পর খাতুনগঞ্জে ভারতীয় পেঁয়াজ প্রতিকেজি ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং মিয়ানমারের পেঁয়াজ প্রতিকেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হওয়া পেঁয়াজও বাজারে আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

পেঁয়াজের বাজার অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে আজ অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত চাক্তাই খাতুনগঞ্জে অভিযান শুরু করলে আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা মূল্য স্বাভাবিক রাখার অঙ্গিকার করেন।

ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পেঁয়াজের বাড়তি দাম না নেওয়ার বিষয়ে মুচলেকাও দিয়েছেন। মঙ্গলবার দিনভর খাতুনগঞ্জে অভিযান পরিচালনা করেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ক্ট্টালী সার্কেলের সহকারী কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম।

অভিযানে প্রশাসনের কর্মকর্তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সাতক্ষীরার আমদানিকারকদের সঙ্গে চট্টগ্রামের আড়তদার ও পাইকারি বিক্রেতারা মিলে সিন্ডিকেট গড়ে বাজার অস্থিতিশীল করার প্রমাণ পেয়েছেন। আমদানি মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে পেঁয়াজ বিক্রিরও প্রমাণ স্বচক্ষে দেখেছেন কর্মকর্তারা।

ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, মূলত ২৯ সেপ্টেম্বর রাত থেকে পেঁয়াজের বাজারকে অস্থিতিশীল করে ফেলা হয়েছে। এক রাতের মধ্যে পেঁয়াজের দাম এত বেড়ে যাবার পক্ষে কোনো যুক্তি ব্যবসায়ীরা দেখাতে পারেননি।

মূল্য তালিকায় লিখেছে একরকম, বিক্রি করছে তার চেয়ে বেশি দাম। এক ধরণের অরাজক পরিস্থিতি। অভিযানের পর বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। ব্যবসায়ীরা কথা দিয়েছেন, এই স্থিতিশীল পরিস্থিতি তারা ধরে রাখবেন। সেটা না করলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল আরও বলেন, প্রথমদিন আমরা তাদের সতর্ক করেছি। আড়তদার সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক মুচলেকা দিয়েছেন। অভিযানের শেষদিকে যে স্থিতিশীল দামে বিক্রির কথা তারা আমাদের দিয়েছেন, সেই দামে বিক্রি তারা অব্যাহত রেখেছেন কি না সেটা আমরা দেখব।

পেঁয়াজের আড়ত মেসার্স আবদুল আউয়ালে পেঁয়াজের বিক্রয়মূল যাচাই করেন ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল। সেখানে দেখা যায়, একরাতের ব্যবধানে তার পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে কেজিপ্রতি ৩৮ টাকা।

রোববার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তারা ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি করেছে ৫২ টাকায়। পরদিন সোমবার বিক্রি করেছে ৯০ টাকায়। মঙ্গলবার অভিযানের আগ পর্যন্ত ৯০ থেকে ১০০ টাকা দাম হাঁকাচ্ছিল প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি গত ১১ সেপ্টেম্বর একই পেঁয়াজ ৪২ টাকা, ১৫ সেপ্টেম্বর ৫৬ টাকা, ২৪ সেপ্টেম্বর ৬০ টাকা এবং ২৬ সেপ্টেম্বর ৫৮ টাকায় বিক্রি করেছিল।

শাহজালাল ট্রেডার্স নামে আরেকটি আড়তেও গত রোববার ৬০ টাকায় ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। কিন্তু পরদিনই তারা পেঁয়াজের দাম ৩০ টাকা বাড়িয়ে ৯০ টাকা করে দেয়।

শাহজালাল ট্রেডার্স ২৫ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার ভোমরা বন্দর দিয়ে ৩০২ বস্তা পেঁয়াজ এনেছে। সেই পেঁয়াজ প্রতিকেজির ক্রয়মূল্য পড়েছে গাড়িভাড়াসহ ৫২ টাকা। সেই দামে কেনা পেঁয়াজই মূলত আড়তে আছে।

কিন্তু ভারত রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানোর পর পুরনো দামে কেনা সেই পেঁয়াজের দাম তারা প্রতিকেজিতে ৩০ টাকা বাড়িয়ে দেয় বলে অভিযানে যাওয়া সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

খাতুনগঞ্জের আরেক বড় পেঁয়াজের আড়ত মেসার্স হাজী অছিউদ্দিন সওদাগর। অভিযানের সময় সেখানে আমদানি ও পরিবহনের নথি যাচাই করে ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম নিশ্চিত হয়েছেন যে, সোমবার তাদের আড়তে মায়ানমারের পেঁয়াজ এসেছে। গাড়িভাড়াসহ প্রতিকেজি পেঁয়াজের দাম পড়েছে ৪২ টাকা। সেই পেঁয়াজ তারা বিক্রি করছে ৭৫ টাকা থেকে ৮৯ টাকায়।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিষ্ঠান তিনটিকে স্বাভাবিক দামে পেঁয়াজ বিক্রির নির্দেশনা দেন। এছাড়া বাগদাদী করপোরেশন ও এসএন ট্রেডার্স নামে দুটি প্রতিষ্ঠানকে একই কারণে সতর্ক করা হয়।
মূল্য তালিকায় চেয়ে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করায় মেসার্স খাজা ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাতক্ষীরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মূলত খাতুনগঞ্জের আড়তদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভারতের রপ্তানি বন্ধের প্রেক্ষিতে দাম বাড়ানোর বিষয়টি বলা হয়।

রিপা ট্রেডার্স ও ঢাকা ট্রেডার্স নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এই সিন্ডিকেটই মূলত পেঁয়াজের বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে।

আড়তদারদের কয়েকজনও বলেছেন, সাতক্ষীরা-চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমদানিকারকদের চাপেই মূলত তারা পেঁয়াজ বাড়তি দামে বিক্রি করেছেন।

আজ বিকেলে ব্যবসায়ীদের সাথে প্রশাসনের একটি জরুরি বৈঠকের কথা রয়েছে। পেঁয়াজের বাজার নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ কাউকে দেয়া হবে না বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পেঁয়াজের নামে রাতারাতি যা করা হয়েছে এক কথায় তা অরাজকতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *