আমি বললেও দুই মাস মনে থাকে, ট্রাফিক পুলিশকে প্রধানমন্ত্রী

জাতীয়

Sharing is caring!

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য নিজেকেই দায়ী করতে হবে। অর্থাৎ যিনি রাস্তায় বা গাড়িতে চলাচল করবেন বা গাড়ি চালাবেন সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে সড়কে দুর্ঘটনার জন্য নিজেকেই দায়ী করতে হবে। তা হলে সড়কে দুর্ঘটনা কমবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ট্রাফিক পুলিশকে নির্দেশনা দিলে তা দুই মাসের বেশি থাকে না বলেও আক্ষেপ করেন তিনি।

মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর ফার্মগেটের খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০১৯ উদযাপন উপলক্ষ্যে এক অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন।

সড়ক নিরাপদ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে একটা প্রবণতা আছে যে, কোনো একটা দুর্ঘটনা হলে সবার আগে চালককে গালি দেওয়া হয়। আমাদের চালকদেরও দোষ আছে এতেও কোনো সন্দেহ নেই। সব থেকে বড় কথা তারা যথেষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না এবং প্রশিক্ষণ তাদের দেওয়াও হয় না।

তাই দুর্ঘটনার জন্য কেবলমাত্র চালকদের দায়ী না করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা পথচারী, তারা অনেকটা দায়ী। পথচারীদের ফুটওভার ব্রীজ ব্যবহার না করার প্রবণতা, ফুটপাতে নিয়মকানুন না মেনে রাস্তা পারাপার হওয়ার বিষয়গুলো তো আমরা নিজেরাই দেখছি।

তিনি বলেন, ‘একটা চলন্ত গাড়ি যখন আসে, সেই গাড়ির সামনে দিয়ে শুধুমাত্র হাত দেখিয়ে দৌঁড় মারে। এটা তো একটা যন্ত্র। ব্রেক কষলেও তো সেটা থামতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। এই বোধটা তো আমাদের পথচারীদের থাকতে হবে। ফুটওভার ব্রীজ থাকার পরও তা এড়িয়ে চলার প্রবণতা থাকলে যদি দুর্ঘটনা হয় সেজন্য ড্রাইভারকে আমি দায়ী করবো কিভাবে? পথচারীদেরতো ওখান দিয়ে পারাপার হওয়ার কথা না।

গাড়ির চালকরা একটানা রাস্তায় কতক্ষণ গাড়ি চালাবে, তারা খাওয়া দাওয়া করল কি না, পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছে কি না? সেসব দিকেও সকলকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক সময় আমরা দেখি যে, ঢাকা থেকে কেউ চলে যাচ্ছেন গ্রামে বা তার নিজের বাড়িতে। আবার ওই দিনেই ফিরে আসতে হবে। তিনি কি একবার ভেবেছেন, চালক তো একজনই। আর গাড়ি চালানোটা যে গাড়ি না চালায় সে বুঝবে না যতক্ষণ স্টিয়ারিং হাতে থাকে ততক্ষণ মাথা কতটা চিন্তাযুক্ত থাকে আর কতটা টেনশনে থাকতে হয়। যদি কেউ গাড়ি চালিয়ে থাকেন সে বুঝবেন। এ কারণে ড্রাইভার যখন বেশি সময় চালাতে থাকে তার ঝিমুনি আসাটাই স্বাভাবিক। তখনই একটা দুর্ঘটনা হয়ে যায়।’

চালকদের কিছু প্রবণতাকে দোষারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘হাইওয়ে বা যেকোনো রাস্তায় দেখা গেল, একটা গাড়ি যদি ওভারটেক করল তো আরেকজনের মাথা তখন খারাপ হয়ে গেল। ওই গাড়িকে ওভারটেক করতেই হবে। এই যে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা, এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণেই দুর্ঘটনা হয়ে থাকে।’

পরিবহন মালিক ও নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের রাস্তা যখন তৈরি করা হয়, কত ফিট রাস্তা হবে, সেখানে কত সাইজের গাড়ি চলবে। এগুলো কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে হিসাব করেই তৈরি করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে কি দেখি। বাস যখন তৈরি হচ্ছে, বাসে আরও চারটা সীট বাড়ানোর জন্য বাসটা যতটা লম্বা থাকা দরকার তার থেকে একটু বেশি বাড়িয়ে দিল। একইভাবে লোহার ক্রাম দিয়ে ট্রাক বড় করা হয় যাতে বেশি মালামাল বহন করতে পারে। এখন থেকে কেউ যদি এ ধরনের নিয়মের বাইরে অহেতুক গাড়ির বা ট্রাকের সাইজ বাড়ায়, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

ট্রাফিক পুলিশকেও সচেতন থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমি একবার বলার পরে খুব উদ্যোগ নেওয়া হল, বেশ কিছু কাজ হল। হয়ত আমি বললাম দুই মাস মনে থাকল। দুই মাস পরেই দেখা গেল আমাদের সীজনও চেঞ্জ, মানুষের মনও চেঞ্জ, সবাই সব ভুলে গেল। দয়া করে এটা যেন আর না ভুলে কেউ।’

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দিকে আঙুল তুলে খানিকটা খোঁচা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ। দুমাস পর পর ঋতু বদলায়। আর ঋতু বদলানোর সাথে সাথে গাছপালা ফুল পাখির মতো আমি যেটা লক্ষ্য করি, আমাদের মনও বদলায়।

বাস বা গাড়িতে চলাচলের সময়ও সবাইকে কিছু নিয়ম মেনে চলাচল করার পরামর্শ দেন তিনি। বলেন, গাড়িতে বসে হাতটা বাইরে বের করে রেখে দিলাম বা কনুইটা বের করে রেখে দিলাম। আর সেখানে যদি দুর্ঘটনা হয়। সেজন্য কে দায়ী? হ্যাঁ, এখানে আমাদের সুবিধা আছে, একটা রিট করলে হাইকোর্টে গেলেই অর্ডার দিয়ে দেবে। কিন্তু তারা দেখবে না দোষটা কার। ওই বিচারটাও তাদের করতে হবে যে, দোষটা কার?

‘কারণ গাড়িতে বসে, বাসের মধ্যে হাত ঝুলিয়ে রাখা এটা তো যাত্রীদের নিয়ম না। তাই দয়া করে কেউ বাসে বসে জানালা দিয়ে হাত ঝুলে অথবা কনুইটা রেখে দেবেন না। যেকোনো একটা গাড়ি লাগাতে পারে। তার জন্য নিজেকে দায়ী করতে হবে। অন্যকে দায়ী করলে কোন লাভ হবে না, এটা হল বাস্তবতা।’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।

চালকদের প্রশিক্ষণ ও গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এখন আন্তর্জাতিকভাবে সব দেশে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু এটা চালকদের ক্ষেত্রে না। রাস্তায় হাঁটার সময় মোবাইল ফোন দিয়ে কথা বলতে বলতে শুধু সড়কে না, আমরা দেখি রেললাইনের পাশ ধরে মোবাইলে কথা বলতে বলতে হাঁটছে। পেছনে যে রেল আসছে সে আওয়াজ আর শুনতে পাচ্ছে না। কথায় মশগুল। আমরা এমনিতেই একটু কথা বলতে বেশি পছন্দ করি। পথচারীদের এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।

রাস্তার ফুটপাত দখলের বিষয়ে ক্ষোভ জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘ফুটপাতগুলি দখলমুক্ত করতে হবে। সেখানে হাঁটার জায়গা থাকে না। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, শপিং মলের সামনে গাড়ি পার্কিং করা হয়। এ বিষয়ে ট্রাফিককে টোল সিস্টেম রাখতে হবে। কয় ঘন্টা রাখা হল, কেন রাখা হল, তাদের ফাইন করতে হবে। অবশ্য এটা করা আছে। আর যে যত বেশি এ রকম ফাইন আদায় করতে পারবে, একটা পার্সেন্টজও যেন তাকে দেওয়া হয়। আমরা সে ব্যবস্থাটাও করে দিচ্ছি, তাহলে ডিসিপ্লিনটা ফিরে আসবে।’

সকলকে সড়কে আইন মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সড়কের কিছু আইন আছে, যেটা মেনে চলতে হয়। কিন্তু সে সম্পর্কে আসলে সচেতনতাও সৃষ্টি করা হয় না। এটাও আরেকটা সমস্যা। তাই এখন স্কুল কলেজ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা একান্তভাবে প্রয়োজন। এছাড়া, সরকার পেশাদার নতুন এক লাখ দক্ষ গাড়ি চালক তৈরি এবং তিন লাখ গাড়ি চালক তৈরির জন্য নতুন একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক রুল শেখানো দরকার বলে দাবি করে প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করে তাদের প্রতিনিধি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার বলেও মত দেন তিনি।

সড়ক-মহাসড়কে শিক্ষার্থী ও শিল্প-কালকারখানা এলাকায় পারাপারের সময় ওই এলাকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ উদ্যোগে দায়িত্ব নিয়ে নিরাপদে রাস্তা পারাপার সাহায্য করার অনুরোধও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এতে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি একাব্বর হোসেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের কার্যকরি সভাপতি ও সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের নেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *