মহিউদ্দিন চৌধুরী বললেন ‘বারে বারে আমারই ক্ষতি হয়!’

প্রচ্ছদ ভাইরাল মতামত

Sharing is caring!

এ কে এম বেলায়েত হোসাইনঃ- ১৯৮৭ সাল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল সারা দেশ। একের পর এক হরতাল অবরোধ কর্মসূচি চলছিল। সরকার পতন আন্দোলনের লাগাতার কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ১০ নভেম্বর ঢাকায় সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষনা করা হয়। সে সাথে দেশব্যাপী চলছিল সরকার বিরোধী লাগাতার মিছিল মিটিং হরতাল অবরোধ কর্মসূচি।

সিদ্ধান্ত ছিল ১০ নভেম্বর ঢাকার অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ গ্রহনের জন্য আগের দিন ৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ছাত্রলীগ-যুবলীগের আগ্রহী কর্মীদেরকে ঢাকা পাঠানো হবে। আমরা চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মকর্তা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেকান্দর হায়াত খানের নেতৃত্বে গোপন স্থানে বৈঠক করে আন্দোলনের কর্মসূচী বাস্তবায়নে কাজ করতাম। সাধারণ সম্পাদক এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী তখন জেলখানায় বন্দী ছিলেন। জেলখানা থেকে তিনি আমাদের নিকট সোর্সের মাধ্যমে জরুরী নির্দেশনা দিতেন। আমরা কোনদিন কোথায় বসব সেবিষয়ে কো-অর্ডিনেট করতো ছাত্রলীগ নেতা হাসান মাহমুদ শমসের।

নভেম্বরের ৯ তারিখের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় নজু মিয়া লেইনে প্রয়াত শামসুল আলম শামসুর বাসায়। সেদিন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন : প্রয়াত সেকান্দর হায়াত খান, শ্রম সম্পাদক লিয়াকত আলী খান, সদস্য মোহাম্মদ জাফর, ছাত্রনেতা হাসান মাহমুদ শমসের এবং আমি। আমি তখন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ছিলাম। সকাল দশটার কিছু পরে সেখানে হাজির হয় দুজন মহিউদ্দিন ভক্ত নিবেদিত প্রান দলীয় কর্মী সন্তোষ ও স্বপন। প্রয়াত সেকান্দর হায়াত খানের পরামর্শে আমি লিয়াকত আলী খানকে আমার নিকট রক্ষিত টাকা থেকে দশ হাজার টাকা দিলাম। লিয়াকত টাকা নিয়ে সন্তোষ এবং স্বপনকে সহ বেরিয়ে গেল। আমরা বিকাল দুইটার পর রেলওয়ে ষ্টেশনে গেলাম। প্রায় দেড়শ টিকিট অগ্রিম নিয়ে রাখা হয়েছিল। ঢাকা যেতে ইচ্ছুক ছাত্র কর্মী দের প্রত্যেককে একটি টিকেট এবং ফিরতি টিকেটের টাকা এবং অতিরিক্ত আরও একশত টাকা করে দেয়া হল। তারা বিকাল তিনটার ট্রেনে ঢাকা যাবে।

ট্রেন ছেড়ে যাবার কিছুক্ষণ আগে তদানিন্তন চট্টগ্রাম উত্তরজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মঞ্জু এসে বলল উত্তর জেলার কয়েকজন ছাত্র ঢাকা যাওয়ার জন্য এসেছে কিন্তু নেতারা কেউ আসেননি।সেকান্দর ভাই’র সঙ্গে আলাপ করে আমার কাছে থাকা উদ্বৃত্ত টিকেট এবং টাকা মঞ্জুর হাতে তুলে দিলাম। আমরা জুবিলী রোড আমতলায় বিক্ষোভ সমাবেশে এসে দারুল ফজল মার্কেট ভবনের সামনের ফুটপাতে দাঁড়ালাম। এসময় ছাত্রলীগের নেতা আশেক রসুল টিপু এসে বলল, সন্তোষে এবং স্বপন বোমা বিষ্ফোরণে নিহত হয়েছে। ঘটনাস্থল আশকার দীঘির পাড় থেকে পুলিশ ক্ষত বিক্ষত বিকৃত লাশগুলো নিয়ে গেছে। দুই সন্তানের পিতা সন্তোষ এবং যুবক স্বপন ছিল চট্টগ্রামে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ।

দুদিন পর মহিউদ্দিন ভাই সোর্স ওহাবের মাধ্যমে জেলখানা থেকে একটি চিরকুট লিখে পাঠান। চিরকুটের পাঁচটি শব্দ আমার হৃদয়কে বুলেটের মত বিদ্ধ করেছিলো। তিনি লিখেছি – লেন,★”বারে বারে আমারই ক্ষতি হয়।” এখানে ত্যাগী কর্মীদের জন্য তার অকৃত্রিম ভালবাসার নিদর্শন পাওয়া যায়। এ ভালবাসা তাকে বানিয়েছিল জননেতা।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে নিহতদের সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের লোক উল্লেখ থাকায় সরকারি গন-মাধ্যমে দু’জন ভারতীয় নাগরিক নিজেদের তৈরী বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। আমরা সেদিন লাশগুলো তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থাও করতে পারিনি।

এঘটনার প্রায় দু’যুগ পর একদিন মহিউদ্দিন ভাই আমাকে তার শোয়ার ঘরে ডেকে নিয়ে বললেন, আপনাদের কিছু লোকের ঋণ আমি শোধ করে যেতে পারবোনা। হঠাৎ এসব কেন বলছেন জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, গত- কাল সন্ধ্যা পাথর ঘাটায় এক বিয়েতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ হাতে শাখা পরা দুটো মেয়ে এসে আমাকে নমস্কার বলে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করল। আমি তাদের মাথায় হাত রেখে বললাম
,তোমাদেরকে চিনতে পারলামনাতো। তারা অত্যন্ত ক্ষীণ কন্ঠে বলল,আংকেল আমরা সন্তোষ বাবুর মেয়ে। পরিচয় জেনে আমি মেয়ে দুটিকে আমার দু’পাশে বসালাম।তাদের কাঁধে হাত রেখে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। কোন কথা বলতে পারলামনা। কথা বলতে গেলে আমি কান্না চেপে রাখতে পারতামনা। বলতে গিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।

ঘটনার আকস্মিকতায় আমার নিজেরও বোবা -কান্না চেপে বসল। সন্তোষ-স্বপনদের মত শহীদদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের সরকার। সর্বস্তরের ক্ষমতাসীন নেতাদের এ সত্য উপলব্ধির সময় এসেছে। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বালাখানা নয়। যুগে যুগে সত্য বলার উত্তমস্থান লালদিঘি ময়দান।

লিখেছেন -একেএম বেলায়েত হোসাইন
উপদেষ্টা,চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *