রইন্যার লাশ না ফেললে আমার নাম ফয়সল ইকবাল না!

প্রচ্ছদ রাজনীতি

Sharing is caring!

একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জম্ম দিয়ে বেহাল তবিয়তে আছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী। তার এসব ক্ষমতা প্রদর্শমূলক আচরণে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠছে- কার আশ্রয় পশ্রয়ে ফয়সল ইকবাল বেপরোয়া হয়ে উঠেছে? কার খুঁটির জোরে তিনি এমন ক্ষমতা প্রদর্শনমূলক হুমকি-ধমকি দিচ্ছে?

সর্বশেষ চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনির লাশ ফেলার হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ফয়সল ইকবালের বিরুদ্ধে। নগরীর হালিশহর ওয়াপদা মোড় এলাকাস্থ ‘করোনা আইসোলেশন সেন্টার চট্টগ্রাম’র প্রধান উদ্যোক্তা মো. সাজ্জাত হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলার সময় এই হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ উঠে।

মো. সাজ্জাত হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথোপথনে সাবেক ছাত্রনেতা নুরুল আজিম রনির লাশ ফেলার হুমকি দিয়ে ডা. ফয়সল ইকবাল বলেন, ‘রইন্যার (নুরুল আজিম রনি) মতো চোর-ডাকাতের সাথে কী? দেশ একটু সুস্থ হোক। ওর লাশ দেখা যাবে। ওর লাশ যদি না ফেলি আমার নাম ফয়সল ইকবাল না।’

হালিশহর ওয়াপদা মোড় এলাকায় ‘প্রিন্স অব চিটাগাং’ কমিউনিটি সেন্টারে তৈরি হওয়া ‘করোনা আইসোলেশন সেন্টার চট্টগ্রাম’র উদ্যোক্তাদের হেয় প্রতিপন্ন করে করে ডা. ফয়সল অডিওতে বলেন, ‘নাই ডাক্তার, নাই, কিছু নাই। ভংচং করার দরকারটা কী?

‘ডাক্তার নাই আপনাকে কে বললো?’ তরুণ উদ্যোক্তা সাজ্জাত হোসেনের এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ডা. ফয়সল অন্য প্রসঙ্গ টেনে এনে করোনা আইসোলেশন সেন্টার চট্টগ্রাম’র উদ্যোক্তাদের ‘চোর-ডাকাত’ উল্লেখ করে এবং সিটি মেয়রের সাফাই গেয়ে বলেন, ‘রোগীর যেটার অভাব, আইসিইউ, ন্যাজাল ক্যানোলা, ওখানে কী আছে? সেখানে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন আছে? নাকি আর কী আছে? মানুষ শোয়ায় রাখার জন্য একটা দরকার, মেয়রেরটা যথেষ্ট, ওখানে ডাক্তাররাও আছে। আর ওখানে দুনিয়ার চোর-ডাকাত সবগুলোরে নিছ, এখানে আমরা যাবো না?

এক পর্যায়ে ফয়সল বলে উঠলেন, ‘চোর-ডাকাত নিয়ে তুমি ইয়া করো, হ্যা! ওখানে আবার তোমরা পিকনিক পার্টি কর! মানুষের টাকা-চাঁদা তুলে।’

‘পিকনিক পার্টি করি মানে?’ সাজ্জাত হোসেন এমন প্রশ্ন করলে ফয়সল ইকবাল প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলা শুরু করেন। এক পর্যায়ে ফয়সল ইকবাল বলে উঠলেন, ‘চোর-ডাকাতের সাথে থেকে লাভ নেই। রইন্যার (নুরুল আজিম রনি) মতো চোর-ডাকাতের সাথে কী? দেশ একটু সুস্থ হোক। ওর লাশ দেখা যাবে। ওর লাশ যদি না ফেলি আমার নাম ফয়সল ইকবাল না।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি বলেন, ‘অপশক্তি আমাকে মারার চেষ্টা করবে, ক্ষতি করার চেষ্টা করবে, আমরাতো ভিআইপি লোক না!’

নুরুল আজিম রনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের চিকিৎসা ব্যবস্থা নষ্ট করেছে ডা. ফয়সল ইকবাল ও ডা. লিয়াকত। তারা সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং ভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমি কয়েকবার মানবন্ধন-আন্দোলনও করেছি। তাদের কারণেই কিন্তু চিকিৎসাহীন মানুষ পথে পথে মারা গেছে। এমনকি তাদেরকে গ্রেফারের দাবিও করেছি।’

‘আমার ওপর তারা ক্ষুদ্ধ হতে পরে। তাদের ওপর নিশ্চয়ই রাজনৈতিক ছায়া আছে, যাদের ছায়া আছে তারা সব সময় আমার বিরুদ্ধে লেগেই থাকে।’- যোগ করেন রনি।

ডা. ফয়সলের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের যত আমলনামা

করোনা পরিস্থিতিকে পুঁজি করে চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিয়ে রাজনীতি ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে রাখার অভিযোগ উঠেছে ডা. ফয়সল ইকবালের বিরুদ্ধে। এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ডাক্তার ফয়সল ইকবাল স্ট্যাটাস দিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরুৎসাহিত করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ নিয়ে অনেক খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

এমনকি কেন্দ্রীয় বিএমএ ও সকল বিএমএ শাখার নেতারা এখন ও কিভাবে বহিষ্কার না হয়ে চেয়ারে বসে আছে বলে ক্ষমতা প্রদর্শনমূলক প্রশ্ন তুলেছেন বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার নেতা ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী। তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘অবিলম্বে কেন্দ্রীয় বিএমএ-এর প্রস্তাবনার যথাযথ বাস্তবায়ন করে নিরবিচ্ছিন্ন চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করুন। বিদ্রঃ ভয়ে ভয়ে শেয়ার করলাম আবার না তিনি বলে বসেন, কেন্দ্রীয় বিএমএ ও সকল শাখার বিএমএ নেতারা এখনও কিভাবে বহিস্কার না হয়ে চেয়ারে বসে আছে?’

এরও আগে ‘নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের কেই নিতে হবে’ শিরোনামে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরুৎসাহী করে ফের আরও একটি স্ট্যাটাস দেন তিনি। তিনি স্ট্যাটাসে পিপিই সরবরাহে সরকারে ফের অপপ্রচার করে লিখেছেন, ‘আমি কি ভুল বলেছিলাম? আমার কেন্দ্রীয় মহাসচিব কি বলেছেন দেখেন। সরবরাহ চেইনে কারা জড়িত ছিল যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হোক। এদের কারণেই আজ পর্যন্ত আক্রান্ত চিকিৎসকের সংখ্যা ৩২৪। বিদ্র : কাউকে কটাক্ষ করে খারাপ ভাষায় কিছু না লেখার অনুরোধ রইল।’

এছাড়াও করোনাযোদ্ধা চিকিত্‍‌সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরুৎসাহিত করে এবং শেখ হাসিনা সরকারকে বিব্রত পরিস্থিতি ও প্রশ্নবিদ্ধ করে অপপ্রচার করে লিখেছিলেন ‘দেশ তো দেখি পিপিপিতে সয়লাব, ভিক্ষুকও পিপিপি পড়ে ভিক্ষা করছে। সন্মানিত চিকিৎসক ও চিকিৎসাসেবাকর্মী ভাইয়েরা, লাইভ-এ দেখলাম ১০ লাখের অধিক বিতরণ। আপনারটা পেয়েছেন তো? পিপিপি নয় PPE’

অথচ চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র তখন জানিয়েছি, এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ১০ হাজার ৬শ ৫৬ টি ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) বিতরণ করা হয়েছে৷ বর্তমানে জেলায় ২৩ হাজার ৪শ ৪৭ টি পিপিই মজুদ আছে৷ সরকার শীঘ্রই এন-৯৫ মাস্কসহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করবে বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

অন্যদিকে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চিকিত্‍‌সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যেভাবে পরিষেবা দিচ্ছেন, সে জন্য তাঁদের সাহসিকতার পুরস্কার দেবে বলেও ঘোষণা করেছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিএমএ নেতার ফেইসবুকে এমন সব স্ট্যাটাস দেখে সচেতন নগরবাসী মনে করছেন, ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী করোনাযোদ্ধা চিকিত্‍‌সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরুৎসাহিত করে দায়িত্বে থেকে সরকারের অপপ্রচার করছেন।

১ ফেব্রুয়ারি এক নারী চিকিৎসককে শনিবার হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছিল ডা. ফয়সলের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নিজের নিরাপত্তা চেয়ে চমেক হাসপাতালের পরিচালক বরাবর আবেদনও জানিয়েছিলেন সেই নারী চিকিৎসক।

২০১৮ সালে শিশু রাইফা হত্যার ঘটনায় বেসরকারি হাসপাতালে কথায় কথায় মানুষ জিম্মিকারী উল্লেখ করে ডা. ফয়সল ইকবালের চিকিৎসা সনদ বাতিল করারও কথা উঠেছিল নগরবাসীর এক মানববন্ধন থেকে। সেদিন মানবন্ধনে বক্তারা বলেছিলেন, চট্টগ্রামের অধিকাংশ ডাক্তার সুনামের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। কিন্তু কিছু অসাধু চিকিৎসক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছেন। চিকিৎসক নামের কলঙ্ক এসব মানুষ এ পেশার অবমাননা করছেন। তারা চিকিৎসার নামে বাণিজ্য করছেন। বিএমএকে ব্যবহার করে চিকিৎসক নামধারী ফয়সল ইকবাল চৌধুরী চট্টগ্রামে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি করছে।

এমনকি ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকের অবহেলায় সমকালের সাংবাদিক রুবেল খানের আড়াই বছরের শিশু রাইফা খানকে হত্যার বিচারে তিন দফা দাবিও জানান সাংবাদিক সমাজ। সেদিন সাংবাদিকদের হুমকিদাতা চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতকে জিম্মিকারী ডা. ফয়সল ইকবালের হাতে জিম্মি চট্টগ্রামের ১ কোটি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী মানুষকে মুক্ত করতে সাংবাদিক-জনতার ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনও করেছিল।

উল্লেখ্য, ডা. মোহাম্মদ ফয়সল ইকবাল চৌধুরী একাধারে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক, স্বাচিপ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, করোনা প্রতিরোধে স্বাচিপ এর বিভাগীয় সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক পদের দায়িত্ব পালন করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *