সিনেমা ও আত্মহত্যা

মতামত মুক্তচিন্তা

Sharing is caring!

তানভিরুল মিরাজ রিপন» আজকে এগিয়ে চলার নামে যে ওয়েব সিরিজ গুলো বানাচ্ছেন, তারা যখন পীর হাবিব সানি লিওনের নাম করে কলাম লেখলে প্রতিবাদ করে, তখন তাদের এ নিয়ে বুক কাপেনা যে আর্ট মানে আর্ট, আর্টে মাগী যেমন পবিত্র, আর্টে সমান ভাবে ধর্মীয় চূড়াগুলোও পবিত্র। নাটক হতে হয় ‘সংলাপ এবং অভিনয় নির্ভর’ বুকের সাইজ ‘৩৪’ কিম্বা ‘থাই সাইজ ৩৫’ নির্ভর নয়। এই যে আমরা মেঘে ঢাকা তারা দেখে এখনো মুগ্ধ হই,সেখানে কিন্তু রঙ নেই,বুক ও পেটের ভাজ নেই,অথবা অপুর সংসার দেখেছি যারা,নায়ক এসবেও নায়িকার ভূমিকা ছিল। কিন্তু বুক নাচানোর মত ভূমিকা লাগতো না। মানুষ আজও মুগ্ধ হয় এ কারনে যে সিনেমা গুলো সত্যি মানুষের সাথে মিলে গেছে৷

এ কালের সিনেমার কথা বলি, ‘বেলাশেষে’ দেখতে দেখতে যখন একেকটা একেকটা দূর্দান্ত সংলাপ আপনার সকল নিউরনকে সজাগ করছে। ইনেক্টিভ হরমোন গুলো যেমন মানুষকে বিশ্বাস করার জন্য তাড়িত করছে তখন মানুষ আটকে যাবে তাঁর জীবনের মিল দেখতে পেয়ে। ‘হাতের ওপর হাত রাখা সহজ, সারাজীবন বয়তে পারা সহজ নয় ‘ অথবা ‘আমি প্রেমে পড়েছি’ যদি আপনি পোস্ত দেখেন ‘ প্রায় শেষের সংলাপ ‘মানুষতো। মানুষের মন তো ‘। যদি বলি ‘বসু পরিবার’ সিনেমার ডায়লগ ‘অপর্নাকে দেখে সৌমিত্রর ভালো লাগা প্রকাশ করেছিলো এভাবে ‘ ওকে দেখে আমার কেমন জানি তৃপ্তি লেগেছিলো। তৃপ্তি ‘ অথবা আসুন ‘ অপুর সংসার,পথের পাঁচালি, কিংবা ‘মেঘো ঢাকা তাঁরার সংলাপগুলো আপনাকে ভাবাবে৷

কে ভুলতে পারবে ‘ দাদাকে নীতা যখন বলছে,দাদা আমি তো বাঁচতে চেয়েছিলাম, দাদা আমি তো বাঁচতে চাই।’ এ সংলাপ গুলোর কারণে সিনেমা হয়ে ওঠে একেকটা দর্শন, সিনেমা শুধু বুকের মাপ দেখানোর জন্য, কিংবা একটু আইটেম গান নয়, ‘গরমি’ গানগুলো সিনেমার পার্ট নয়।

ঋত্বিক ঘটক তার সিনেমায় বারবারই প্রতিবাদ করেছেন আমার আপন ঘর হারা হতে হয়েছে, আমাকে উদ্ভাস্ত হতে হয়েছে,আমি তার প্রতিবাদ, আমি কাঁটাতারের, মানুষের,জীবনের,কৃষকের,দখলের প্রতিবাদ করার জন্য সিনেমাকে বেঁচে নিয়েছি। ঋতুপর্ণ ঘোষকে দেখুন না একে একে সমাজেট সবচেয়ে উচ্ছিষ্ট জীবন, তাচ্ছিল্য জীবনগুলোকে নিয়ে এসেছিলেন, উপস্থাপন করেছিলেন মানুষের মাঝে। মানুষ গ্রহণ করেনি? শেষতক নিজেকে ‘চিত্রাঙ্গদা ‘ দিয়ে মানুষকে বলেছেন আমি পৃথিবীরই অংশ,ইতিহাস, যুদ্ধ,জীবন,যাপন,রেওয়াজ রীতির অংশ। ঋতু প্রতিবাদকেও ব্যবসা হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে৷ পারেনি?এক সময় বেশ্যারা নাটক, সিনেমায় আসতো,ছেলেরাও মেয়ে সেজে নাটক করেছে তো। সে চপলা ভাদুড়িকে ঋতু তুলে এনেছিলেন সিনেমায়৷ মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর ‘টেলিভিশন’ কি দর্শন, কুসংস্কারকে মুখ থুবড়ে লাথিটা মারতে পারেনি? পেরেছে।

সিনেমা সত্যি বিনোদন নয়, এটাকে মিডিয়া পাড়া যেভাবে বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করছেন। পৃথিবীর সমস্ত মানুষই সাহিত্য ঘেঁষে বড় হয়, সাহিত্য ও শিল্পকে নির্ভর করে বড় হয়,মানুষের মৃত্যুও তো একটা দারুণ আর্ট। যারা বই পড়ার সময় পায় না,মন বসাতে পারে না চিত্রকলায়,অথবা কবিতা পড়বার আগ্রহ যার কম সে সিনেমা দেখে মানে সে রসদ বা সাহিত্যের বাইরে নয়। সিনেমাও সাহিত্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য।

সিনেমায় যৌনতা কি আসবে না? যৌনতা আসবে। যৌনতা ছাড়া কি জীবন হয়? সম্পূর্ন দর্শন উপস্থাপনে যৌনতা থাকবে। কিন্তু যৌনতার যে একটা আর্ট আছে সেটা মিরা নাইর থেকে দেখিয়ে দিয়েছে, কামসূত্র তো সেটা জানান দিচ্ছে। সিনেমা যারা দেখে,যারা লেখে,যারা বানায় তাঁরা প্রত্যেকে শিল্পী ও গুরুত্বপূর্ণরকম অংশ শিল্পের।

সুশান্ত সিংহ রাজপুত, কিংবা ঋতুপর্ণ ঘোষ,অথবা ঋত্বিক ঘটক এদের মৃত্যু তিনজনের তিনরকম। কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের মতে ‘ শতাব্দী চলছে তো দূর্গা কিছু একটা করতে হবে ‘। সে কিছু করে দিয়ে সত্যজিৎ,ঋত্বিক একই সময়ের হয়ে দুজনে দু-অঙ্গণ থেকে সিনেমা দেখেছেন ভিন্ন ভিউ থেকে। ঋত্বিক ঘটক এর সিনেমা একের পর এক ফ্লপ গিয়েছে,অন্যদিকে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা হিট করেছে খুব।তারা যেকোনো রকমভাবে মানুষকে কমিটেড করতে চেয়েছেন, মানুষকে বলতে চেয়েছেন,মানুষের প্রতিবাদ শিখিয়েছেন, অন্যদিকে ঋতুপর্ণ শিখিয়েছেন প্রতিবাদ আর বেঁচে থাকা, লড়ে বেঁচে থাকা। সুশান্ত রাজপুতের আত্মহত্যার পেছনে একটি কারণও স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে,তাঁর সিনেমার সময়টা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।

আসলে ব্যবসায়ীরা মেধা খোঁজতে চাইছেনা, মুম্বাই বলুন কোলকাতা বলুন, বাংলাদেশ বলুন এরা সিনেমাকে দেখছে শুধুই বাণিজ্য। বাণিজ্যে লস পড়লে তারা দোষারোপ করেন সংশ্লিষ্ট আর্টিস্টদের। তাঁরা আর্ট কিম্বা আর্টিস্ট কিছুই চায় না। টাকা টাকা করে তাঁরা প্রত্যেককে বিচার করছেন।

একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ-

ডিপ্রেশন আমিও বহন করেছি। ছয় মাস। ডিপ্রেশনটা মূলত স্বাভাবিক জীবন যাপনে একটু বাঁধা পড়লে যে কারো হতে পারে। একজন সুস্থ সবল মানুষের অন্তত মাসে একবার মনো চিকিৎসকের সাথে বসা উচিত৷ আমার বিশেষ প্রব্লেম হয়েছিল আমি আমার কাজের কারনে অনিরাপদ বোধ করতাম। আমি ঘরকুনো, আর তিনজনের বেশি মানুষকে সহ্য করতে পারতাম না। আমার প্রফেশনাল কাজের চাপ,অনিরাপদ ভাবতে ভাবতে মনে করছিলাম আপাতত আমি পড়াশুনায় মনোযোগ দিই,তাও পারিনি পরে আমার বন্ধুর কঠোর হওয়াতে আমি ডাক্তারের কাছে যাই একবার দেখানোর পর আমি মোটামুটি সুস্থ হচ্ছিলাম, দ্বিতীয় মিট আমি এতো বাজে রিয়েক্ট করেছিলাম ডাক্তারকে গালিগালাজ করে পেসক্রিপশন ছিড়ে ফেলি। ডাক্তার সেদিন তার ধৈর্য্য দেখিয়ে বললেন বসুন, কেমন লাগছে, আগের চেয়ে ভালো লাগছে না।আমার চোখ দিয়ে পানি চলে আসলো, আসলে আমি কাজ না করে পারি না, আমার অন্যরকম লাগছে, আমি রেডিও জকি প্রফেশনে ছিলাম অথচ আমার কথা বলতে তালগোল পেকে যাচ্ছে। আমি স্রেফ নিতে পারছি না এভাবে। ডাক্তার বললো আপনার বন্ধু সময় দিচ্ছে না? ওনি আসে না কেনো? আমি বললাম কাজে থাকে, ওর তো ক্লাস থাকে। ফোনে কথা বলে না? বলে, তাহলে আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন শুধু ঘরে থাকবেন না। হাটবেন। কেউ কথা বলতে চাইলে কথা বলবেন। আমি আসলেই সবার সাথে কথা বলি না, আবার যখন দেখি শিখতে পারছি তখন বলি। তাহলে আপনি হাটুন। আর বাসাটা বদলান। আসলে আমি খুব শকড ছিলাম যে, যেটা আমি আমার বন্ধুকে ছাড়া আর কাউকে বলতে পারিনি। আমার বন্ধু বলেছিল এটা খুব সিম্পল এটা ঘটে, সবার সাথে।

আমার বন্ধু টিপিক্যাল ঘরানার লোক নয়, মানে তোকে দাড়াতে হবে,কথা বলতে হবে, এসব করতে হবে এভাবে বলেনি। এভাবে সময় দিয়েছে যে আমাকে শকডটা দিলো তাকে খুব গালি দিতো আমার সামনে, আমার এ জিনিসটা খুব ভালো লাগতো।

এক বছর মতো ওষুধ খেতে হয়েছে, এখন আমি স্বাভাবিক, সুস্থ। তবে এ লকডাউন আমার জন্য খুব বিপদ জনক।তাই অন্তত বন্ধু সময়টা দেয়, নতুন কিছু বলতে সবসময়ই বই পড়তাম বলে আমার বন্ধুর একটা বকা আমার শুনতে হয়। তাই বই না পড়ে বাচ্চাদের সাথে একটু কথা বলি, ঝগড়া করি। কেঁটে যাচ্ছে।

ডিপ্রেশন খুব খারাপ জিনিস তা মাত্র স্বাভাবিক জীবন ব্যহত হলেই যে কারো জীবনে আসতে পারে। আসলে আমাদের একজন বন্ধু লাগে, একজন বন্ধু আপনার, আমার জীবনের রসকে ১০০% সত্য করে রাখতে পারে। বন্ধুত্বতা লেনদেনের মতো ডিল নয় বন্ধুত্ব একটা দ্বায়িত্ব, একটা জীবনের পরিপূরক। বন্ধুকে অনুভব করতে হয়।

আমাদের সমাজে সমকামী ধারনাটা প্রায় নতুন করে মানুষ জানছে৷ এটা বহুকাল ধরে প্রচলিত যদিও। কিন্তু বন্ধুত্ব, বন্ধুর প্রতি যত্ন তারও বহুকাল আগে। আমি তো বন্ধু্ত্ব শিখি যত্ন করে। বন্ধুর সাথে বন্ধু হাটলে,কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাটলে,একটু আলাদা সময় দিলে সমকামী হয়ে যায় না, এ কারনে অনেকে বন্ধুর প্রতি এটাচড হতে চায় না,লোকে অন্যকিছু ভাববে বলে। সমকাম আর বন্ধুত্ব আলাদা বিষয়। বন্ধু আপনার, আমার একটি অনুভূতির অঙ্গ। যার সাথে সেক্স হয় না বলে সমস্ত অনুভূতি গুলো তাঁকে ঘিরেই সক্রিয় থাকে।

কিছুদিন আগে এক জুনিয়র ফোন করে বলছে,ভাইয়া আমি আমার পড়াশুনা নিয়ে খুন ডিপ্রেশড, আমার শাইন কি আদৌও হবে? তাঁকে বলেছিলাম, থিওরী নিয়ে কিছু করতে গেলে তুমি শাইন হবে না, তোমার জন্য তোমার নতুন থিওরী বানাতে হবে,অন্যজনের থিওরী ভাঙতে হবে, এ ধরনের ভাঙনে একটা মজা আছে।

আত্মহত্যা নয়, কথা বলুন, বলতে দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *